অনুবাদ- মঁসিয়ে ভালদেমারের অদ্ভুতুড়ে ঘটনার সত্য-এডগার অ্যালান পো, ভাষান্তর সপ্তর্ষি চ্যাটার্জি-শরত’২০২৫

সপ্তর্ষি  চ্যাটার্জির আরো গল্প ঝন্টুর ঝঞ্ঝাট, জন্মান্তর, রক্তসূত্র, বুদ্ধি যখন বাড়ে

মূল কাহিনি- দ্য ফ্যাক্টস এন্ড অফ দ্য কেস অফ মঁসিয়ে ভালদেমার

মঁসিয়ে ভালদেমারের অদ্ভুতুড়ে ঘটনাটায় কেন যে চারদিকে আলোড়ন পড়ে গেছিল, তা নিয়ে খামোখা আশ্চর্য হওয়ার ভান করে বিশেষ কাজ নেই। গোটা ব্যাপারটাই যাকে বলে অলৌকিক। প্রথমে ভেবেছিলাম বিষয়টা লোকসমাজের সামনে চট করে বলা ঠিক হবে না, এর পিছনে একটা কারণ অবশ্যই ব্যাপারটা নিয়ে আরেকটু গভীর অনুসন্ধানের ইচ্ছা। যাতে এই অভূতপূর্ব কাণ্ডের উপর কিছুটা আলো ফেলা যায়, যা এই জটিল ধাঁধার অন্ধকারকে খানিকটা সহজ আর স্পষ্ট করে তুলতে পারে। কিন্তু এই ঢাক-ঢাক গুড়গুড় করতে গিয়ে চারদিকে এমন সব গুজব রটা শুরু হল, যে আসল ঘটনাটার বদলে লোকজন গল্পের গরু গাছে ওঠার মতো একখানা বিদঘুটে বর্ণনাকেই সত্যি বলে ভাবতে বসেছিল। তাতে করে লোকজন রীতিমতো নিন্দেমন্দ করতে থাকল এটা নিয়ে, কেউ ব্যঙ্গ করল, কেউ বা একে নেহাত মিছে কথা বলে দেগে দিল।

এই কারণেই, এখন ঠিক করেছি, আসল সত্যিটাই সবার সামনে তুলে ধরব। ছোটো করে বলি তবে-

বিগত তিন বছর যাবৎ বশীকরণ বিদ্যায় আমার ঝোঁক বেড়েছিল। বেশ চলছিল। মাস নয়েক আগে হঠাৎ একদিন খেয়াল করলাম, নিরন্তর প্রচুর চর্চা-পর্যালোচনা করে চলেছি বটে, কিন্তু একটা মোক্ষম জিনিস বাদ থেকে গেছে বরাবর! সেই ব্যাপারটা নিঃসন্দেহে চমকপ্রদ, তার চেয়েও বড় কথা, কোনও যুক্তি-প্রতিযুক্তি খাটিয়েও তার ব্যাখ্যা দেওয়া মুশকিল।     

বিষয়টা এরকম। আসলে এতদিন ধরে কোনও না কোনও সচল জীবিত মানুষকেই সাধারণত বশীকরণ করার চেষ্টা হয়েছে, কত না অগুনতিবার, কিন্তু কোনও মুমূর্ষু রোগী বা মৃত ব্যক্তিকে বশে আনার চেষ্টা মনে হয় কেউই করেননি। তবে  মৃত্যুপথযাত্রী একজন মানুষকে যদি বশীকরণ করা যায়, তাহলে পরপারে যাওয়ার পর ঠিক কী কী ঘটে, সেই বিষয়ে তো বাস্তব অভিজ্ঞতা পাওয়া যাবেই। হয়তো ওই বশীকরণের জোরেই আসন্ন মৃত্যুকেও রুখে দেওয়া সম্ভব। 

এমনতর আজব পরীক্ষায় নামার আগে বেশ কিছু জিনিস খেয়াল রাখা জরুরি।

প্রথমত, মৃত্যুকালীন মুহূর্তে লোকটির উপর কোনও চৌম্বকীয় প্রভাব পড়ছে কিনা। দ্বিতীয়ত, যদি তেমন কিছু ঘটেও, তবে ওই পরিস্থিতির পক্ষে সেটা অনুকূল না প্রতিকূল হচ্ছে। আর তৃতীয়ত, কতক্ষণ অবধি বা কতদূর পর্যন্ত আসন্ন মৃত্যুকে এভাবে রুখে যাওয়া সম্ভব।

আরও কিছু বিষয় থাকতে পারে, তবে এই ব্যাপারগুলোই আমাকে সবচেয়ে বেশি ভাবিয়ে তুলল। কৌতূহল আর দমিয়ে রাখতে পারলাম না। যতক্ষণ না জিনিসটা নিজে হাতেকলমে করতে পারছি, স্বস্তি পাচ্ছিলাম না।

কিন্তু এমন অনন্য পরীক্ষা করতে গেলে কার সাহায্য নেওয়া যেতে পারে? হঠাৎ করেই আমার বিশ্বস্ত বন্ধু মঁসিয়ে আর্নেস্ট ভালদেমারকে মনে পড়ে গেল।

তিনি ‘বিবলিথিকা ফরেনসিকা’ বইটির স্বনামধন্য সঙ্কলক। আবার ‘ইসসাছার মার্ক্স’ ছদ্মনামে তাঁর লেখা ‘গর্গনচুয়া’ আর ‘ওয়ালেন্সটাইন’ বই দুটোও যথেষ্ট বিখ্যাত। মঁসিয়ে ভালদেমার সেই ১৮৩৯ সাল থেকেই মূলত নিউইয়র্কের হারলেমের বাসিন্দা। চেহারা নিতান্তই সাধারণ। শরীরের নীচের অংশটা জন র‍্যানডল্ফ-এর কথা মনে পড়ায়। তাঁর চুল কুচকুচে কালো হলেও জুলফিটা ছিল ধবধবে সাদা। তাই অনেকেই মনে করত চুলটা আসল নয়, ওটা পরচুলা। এমনিতে খুবই ভীতু মানুষ। বশীকরণের পরীক্ষা-নিরীক্ষার পক্ষে ইনিই হলেন আদর্শ ব্যক্তি। অন্তত দু’তিন বার তাঁকে খুব সহজেই ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছিলাম, সেই সময়ে কোনও সমস্যাই হয়নি। যদিও কয়েকবার বেশ ভুগিয়ে ছেড়েছিলেন তিনি। আসলে ভদ্রলোকের ধরণটা এমনই, যে আগে থেকে মোটেই আন্দাজ করা যায় না ঠিক কী ঘটতে চলেছে। তাঁর মন আর ইচ্ছেশক্তির উপরে কখনওই সম্পূর্ণ দখল আনতে পারিনি। আমরা যাকে ‘ক্লেয়ারভয়েন্স’-অর্থাৎ অতীন্দ্রিয় দৃষ্টি বলি- সেটাতে ওঁর ওপর কোনও কালেই বিশেষ ভরসা করতে পারিনি। অবশ্য এই ব্যর্থতার জন্য আমি তাঁর স্বাস্থ্যের বেহাল দশাকেই দায়ী করেছি। কখন যে তিনি ভালো থাকেন আর কখন যে কাবু হয়ে পড়েন, তার কোনও ঠিকঠিকানা নেই। তাঁর সঙ্গে আমার ভালভাবে পরিচয় ঘটার কয়েক মাস আগেই ডাক্তারারা তাঁকে দেখেশুনে একযোগে জানিয়ে দিয়েছিলেন, তিনি দুরারোগ্য থাইসিসে আক্রান্ত। তবে নিশ্চিত মৃত্যুর সামনেও তিনি অটল ছিলেন। মৃত্যুকে সাদরে গ্রহণ করার মানসিক প্রস্তুতি নিয়েই ফেলেছিলেন তিনি।

এই সব কারণেই ওই উদ্ভট আইডিয়াটা আমার মাথায় খেলতে মসিয়ে ভালদেমারের কথাটাই মনের মধ্যে সবার আগে এল। ওঁর জীবনদর্শন আমার অজানা নয়- তাই আমার অদ্ভুত পরীক্ষায় তিনি কোনও বাধা দিতে যাবেন না, জানি। আর আমেরিকাতেও ওঁর এমন কোনো আত্মীয়-স্বজন নেই যে এতে বাধ সাধবে। তাই বিষয়টা নিয়ে তাঁর সঙ্গে খোলাখুলিই আলোচনা করলাম। তাঁর উৎসাহ আর আগ্রহ দেখে আশ্চর্য হলাম। আসলে আমার সম্মোহনের হাতে বারবার নিজেকে সমর্পণ করলেও এই বশীকরণের ব্যাপারটা কোনও দিনই খুব একটা আহামরি মনে করতেন না তিনি। তাঁর রোগটা তখন এমন পর্যায়ে ছিল, যে মৃত্যুটা কবে কখন ঘটবে, তা নির্ভুলভাবে বলা সম্ভব ছিল না। কিন্তু সেই সময় উনি আমাকে বললেন, ডাক্তার মৃত্যুর দিনক্ষণ বলে গেলে, সে দিনক্ষণের মোটামুটি চব্বিশ ঘণ্টা আগে উনি আমাকে একবার ডেকে পাঠাবেন।

প্রায় মাস সাতেকেরও বেশি আগে মঁসিয়ে ভালদেমারের নিজের হাতে লেখা এই চিঠিটা পেয়েছিলামঃ

“আমার প্রিয় পি-

আপনিও এবার আসতে পারেন। ডি_ আর এফ_ নামে দুজন ডাক্তার কাল মাঝরাতে আমায় জানিয়ে গেলেন, আমার আয়ু বড়জোর আর কালকের রাতটা। আমার নিজেরও মনে হচ্ছে ওঁরা ঠিকই ধরেছেন। আমার সময় ঘনিয়ে এসেছে।

-ভালদেমার”

এই চিঠিটা লেখার আধ ঘণ্টার মধ্যেই সেটা আমার হাতে এসে পৌঁছোলো, আর তার ঠিক মিনিট পনেরোর মধ্যেই আমি নিজেকে ওই মৃত্যুপথযাত্রী রোগীর শয্যার পাশে আবিষ্কার করলাম।

গত দিন দশেক তাঁর দেখা পাইনি। কিন্তু এই দশ দিনের মধ্যেই তাঁর চেহারার যা ভয়ঙ্কর দশা হয়েছে, তাতে শিউরে উঠতে হয়। মুখটা যেন সিসার মতো বিবর্ণ হয়ে গেছে: চোখদুটো একদম নিস্তেজ। চেহারার ক্ষয় হয়ে এতই ক্ষীণ অবস্থা, যে গালের চামড়া ভেদ করে হাড় যেন উঁচু হয়ে বেরিয়ে আসতে চাইছে। নাক-মুখ বেয়ে অবিরাম শ্লেষ্মা ঝরছে। নাড়ির স্পন্দন প্রায় উধাও। তা সত্ত্বেও অটুট মনোবল আর শরীরের অন্তিম শক্তিটুকু আঁকড়ে রয়েছেন এখনও। কথাবার্তায় বেশ স্পষ্ট ভাব। কারও সাহায্য ছাড়া একা একাই নিজের ওষুধ খেয়ে নিলেন। যখন তাঁর ঘরে ঢুকলাম, তখন দেখি একমনে একটা ছোট খাতায় কীসব লিখছেন পেন্সিল দিয়ে। সম্ভবত তাঁর দিনলিপির ফিরিস্তি। তাঁর দুপাশে দাঁড়িয়ে সেই দুই ডাক্তার, ডি এবং এফ। ভালদেমার গাদাখানেক বালিশে ঠেসান দিয়ে কোনোক্রমে নিজেকে খাড়া করে রেখেছেন।

ভালদেমারের হাত ধরে মৃদু চাপ দিয়ে ওই দুই ডাক্তারবাবুকে সরিয়ে একপাশে ডাকলাম। তাঁদের কাছ থেকে বন্ধুর শারীরিক অবস্থার প্রকৃত হালটা জেনে নিলাম। শুনলাম তাঁর বাম ফুসফুসটা গত আঠারো মাস যাবৎ আধা-হাড় আধা-তরুণাস্থির মতো শক্ত হয়ে এসেছে, এখন তো সেটা একদমই অকেজো। শুধু ওটাই নয়, ডান ফুসফুসের ঊর্ধ্বাংশের হালও তথৈবচ। নিম্নাংশটা অজস্র ক্ষতয় আর পুঁজে দগদগে অবস্থায় রয়েছে। কিছু স্থানে তো ফুসফুসে একগাদা ছিদ্র হয়ে পাঁজরের সঙ্গে সেঁটে রয়েছে। ডানদিকের দুর্দশাটা তুলনামূলক নতুন। খুবই অস্বাভাবিক দ্রুততায় এই পরিণতি ঘটেছে। মাত্র একমাস আগেও এমন কোনও লক্ষণই ধরা পড়েনি। বিশেষত ফুসফুসের ওই পাঁজরের সঙ্গে জুড়ে থাকার ব্যাপারটা মাত্র তিন দিন আগেই চোখে পড়েছে। থাইসিস তো ছিলই, তা ছাড়াও হৃদপিণ্ডের প্রধান ধমনীটিও নির্ঘাত বিগড়েছে। যদিও সেটা বা অন্যান্য লক্ষণগুলো যাচাই করে দেখা এখন অসম্ভব। কারণ, হিসেবমতো ভালদেমারের অন্তিম সময় নির্ধারিত আছে আগামীকাল অর্থাৎ রবিবার রাত বারোটা নাগাদ। আর আমি যে সময়ের কথা বলছি সেটা শনিবার সন্ধে সাতটা।

এফ এবং ডি, দুই ডাক্তারকে অনুরোধ করলাম যেন তাঁরা পরদিন রাত দশটা থেকে এই রুগির শয্যার পাশে উপস্থিত থাকেন। কথাটা শুনে অনেক ভেবেচিন্তে কিছুটা নিমরাজি হয়ে দুই ডাক্তার বিদায় নিলেন। আমি ভালদেমারের পাশে গিয়ে বসলাম। তাঁর শরীরের বর্তমান পরিস্থিতি আর আসন্ন পরীক্ষার ব্যাপারে খোলাখুলি কথা বললাম। ঐরকম শোচনীয় পরিস্থিতিতেও তাঁর আগ্রহ আর উত্তেজনা বিন্দুমাত্র কমেনি দেখে বেশ আশ্চর্য হলাম। তিনি অবিলম্বে পরীক্ষাটা করে ফেলার জন্য রীতিমতো তাগাদা দিলেন আমায়। যেন একটুও সময় নষ্ট না হয়। ঘরে একজন পুরুষ সেবক ও একজন মহিলা সেবিকা থাকলেও একজন আস্থাভাজন সাক্ষীর অনুপস্থিতিতে কাজ শুরু করতে ঠিক মন চাইল না। আচমকা কোনও একটা দুর্ঘটনা ঘটলে? তবুও শেষমেশ কাজটা মন দিয়ে করাকেই অগ্রাধিকার দিলাম। ঠিক করলাম, পরীক্ষা শুরু হবে পরের দিন রাত আটটা নাগাদ। ওই সময়ে একজন পরিচিত ডাক্তারি পড়ুয়াকে আমার সঙ্গে ঘরের মধ্যে রাখব। ওর নাম ‘থিওডোর এল’।

***

পরদিন রাত আটটা। আমাদের ডাক্তারবাবুরা এসে না পৌঁছানো অবধি সবাই একটু অপেক্ষা করলেই ভালো হত। কিন্তু ভালদেমারের পীড়াপীড়িতে আর তাঁর শারীরিক অবস্থা দেখে আমি আর খুব বেশি দেরি করতে চাইলাম না।

মিস্টার এল যা দেখেছিলেন আর যা শুনেছিলেন- সবটাই হুবহু প্রতিবেদন আকারে আপনাদের সামনে রাখছি।

ভালদেমারের হাত ধরে জিজ্ঞেস করলাম, “যথাসম্ভব স্পষ্টভাবে এই মিস্টার এল-এর কাছে বলুন তো, এই পরীক্ষায় আপনার মন থেকে সায় আছে তো?”

মৃদু অথচ স্পষ্ট স্বরে তিনি বললেন, “হ্যাঁ, আমি চাই এখুনি আমায় বশীকরণ করা হোক। অনেকটা দেরি হয়ে গেছে ইতোমধ্যেই।”

আর সময় নষ্ট না করে তৎক্ষণাৎ হাতের নাড়াচাড়া চালু করলাম। যে কায়দায় এর আগেও বহুবার তাঁকে ঘুম পাড়িয়েছি। কপালে খানকতক টোকা মারতেই বশীকরণের প্রভাব পড়তে দেখা গেল। কিন্তু রাত দশটা নাগাদ ওই ডাক্তার দুজন এসে না পৌঁছানো পর্যন্ত আশানুরূপ কোনও ফল পেলাম না।

ডাক্তাররা এসে পড়তে তাঁদের প্রশ্ন করলাম, বশীকরণে ওঁদের কোন আপত্তি আছে কিনা; তখন ওঁরা বললেন, রুগির মৃত্যুযন্ত্রণা শুরু হয়ে গেছে-এখন অনায়াসেই বশীকরণের মতো কাজের ঝুঁকি নেওয়া যেতে পারে। আমি তখন হাতের বিভিন্ন মুদ্রা করার পাশাপাশি ভালদেমারের ডানচোখের দিকে একদৃষ্টে চেয়ে রইলাম।

তাঁর নাড়ি তখন মৃদুভাবে টিমটিম করছে, আধমিনিট অন্তর অতিকষ্টে হয়তো একটা শ্বাস ফেলছেন।

পনেরো মিনিট ধরে এমনই চলল। তারপর একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললেন ভালদেমার। শ্বাসপ্রশ্বাসের কষ্টটা আর রইল না বটে, তবে ওই আধমিনিটের ব্যবধানটা কিন্তু রয়েই গেল। তাঁর হাত-পাগুলোও ক্রমশ বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে এল।

এগারোটা বাজতে পাঁচ মিনিট আগেই বশীকরণের আসল আর মোক্ষম লক্ষণগুলো পরিস্ফুট হল। ঘুমের ঘোরে চলেফিরে বেড়ানো লোকেদের চোখের সাদা অংশটায় যে ধরণের ভাবলেশহীন চাহনি ফুটে ওঠে, ঠিক তেমনই দেখছিলাম তাঁর চোখে। কয়েকবার দ্রুত হাত নেড়েচেড়ে দেখতেই তাঁর চোখের পাতাদুটো তিরতির করে কেঁপে উঠে একদম বন্ধ হয়ে গেল। তাতেও আশ্বস্ত না হয়ে খুব জোরে আরও কয়েকবার হাত চালিয়ে আর আমার ইচ্ছাশক্তির যথাসম্ভব প্রয়োগে তাঁর শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলো আগের চেয়ে দৃঢ় আর সহজতর করলাম। নিজের দুই হাত-পা সটান বিছানার ওপর ছেড়ে দিয়ে মাথাটা একটু তুলে স্থির হয়ে রইলেন মঁসিয়ে ভালদেমার।

তখন মাঝরাত। ঘরে উপস্থিত ডাক্তারদের অনুরোধ করলাম ভালদেমারকে একবার ভালোভাবে দেখে নিতে। সবাই একবাক্যে বললেন, উনি এখন পুরোপুরি বশীভূত। ডাক্তার ডি তো অত্যন্ত উত্তেজিত হয়ে সারা রাত এখানে থাকতে চাইলেন। ডাক্তার এফ বললেন ভোর হলেই তিনি চলে আসবেন। মিস্টার এল আর ওই দুজন নার্স রইলেন ঘরে।

রাত তিনটে পর্যন্ত ভালদেমারকে সেভাবেই রেখে দিলাম। ডাক্তার এফ চলে যাওয়ার সময়ে ওঁকে যেভাবে দেখে গিয়েছিলেন, তখনও হুবহু তেমনই। শুধু নাকের সামনে একটা আয়না ধরলে হয়তো বোঝা যেত নিঃশ্বাস পড়ছে। চোখ বন্ধ, হাত-পা মার্বেল পাথরের মত শক্ত আর ঠান্ডা হয়ে এলেও তাঁর শরীরে কোথাও মৃত্যুর কোনও লক্ষণ নেই।

এর আগে ভালদেমারকে বশীভূত অবস্থায় রেখে একটা ব্যাপারে কখনোই পূর্ণ সাফল্য পাইনি। তাঁর ডান হাতের ওপর নিজের হাত চালিয়ে নিজের ইচ্ছাশক্তি প্রয়োগ করেছেন। কিন্তু আমার হাত নাড়ার অনুকরণে তাঁকে ওই হাত নাড়াতে বাধ্য করতে পারিনি! মৃত্যুপথযাত্রী ভালদেমারের ক্ষেত্রেও ব্যর্থ হব ধরে নিয়েই আরেকবার শেষ চেষ্টা করলাম। কিন্তু আশ্চর্য আর অপ্রত্যাশিত সাফল্য এল তাতে। আমার হাত যেভাবে নড়াচড়া করছিল, তাতে তাঁর হাতও একইদিকে নড়তে শুরু করল।

প্রশ্ন করলাম, ‘মঁসিয়ে ভালদেমার, আপনি কি ঘুমোচ্ছেন?’

তিনি উত্তর দিলেন ‘না’। তিরতির করে কেঁপে উঠল তাঁর ঠোঁটজোড়া। পর-পর তিনবার একই প্রশ্ন করায় তৃতীয় বারে ওঁর চোখের পাতা খুলে গেল। সামান্য নড়ে উঠল ঠোঁট এবং দুই ঠোটের ফাঁক দিয়ে অতি অস্পষ্ট ফিসফিসানির মতো ভেসে এল এই ক’টি কথা:

‘হ্যাঁ-ঘুমোচ্ছি। আমাকে জাগাবেন না! দোহাই এভাবেই চলে যেতে দিন।”

হাত আর পা দেখলাম আগের মতই শক্ত অথচ আমি হাত নাড়ালেই উনি ডানহাত একইভাবে নাড়াচ্ছেন।

জিজ্ঞেস করলাম, “আপনি এখনও বুকে ব্যথা অনুভব করছেন?”

তক্ষুনি জবাব এল আগের চাইতে আরো অস্পষ্টভাবে, “কোনো ব্যথা নেই তো! আমি মারা যাচ্ছি!”

ভোরের দিকে ডাক্তার এফ না আসা পর্যন্ত ভালদেমারকে আর বিশেষ ঘাঁটালাম না। এই রুগি এখনো বেঁচে আছে দেখে তিনি তো স্তম্ভিত। নাড়ি টিপে আর ঠোঁটের কাছে আয়না ধরে যাচাই করে নিয়ে আমাকে বললেন প্রশ্নগুলো চালিয়ে যেতে।

আগের মতই মিনিট কয়েক ভালদেমার কোনো জবাব দিলেন না। মনে হল যেন কিছুটা শক্তি সঞ্চয় করছেন। চারবার উপর্যুপরি একই প্রশ্ন করতে চতুর্থবারে অতি ক্ষীণ কন্ঠে তিনি বললেন:

“হ্যাঁ, এখনো ঘুমিয়েই আছি- আমি মারা যাচ্ছি।”

ডাক্তাররা প্রস্তাব দিলেন তিনি মারা না যাওয়া অবধি ভালদেমারের এই সুপ্ত অবস্থাকে টিকিয়ে রাখা হোক। এমনিতেও গণনা অনুসারে মৃত্যুর আর দেরি নেই। বড় জোর আর কয়েক মিনিট।

ভালদেমারকে আবার সেই প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করতেই এক আশ্চর্য পরিবর্তন দেখা গেল তাঁর মুখাবয়বে। চোখের মণি আস্তে আস্তে ঘুরে ওপর দিকে উঠে গেল, চোখের তারা কোথায় যেন উধাও হয়ে গেল উপরদিকে। সেই কারণেই বিবর্ণ হয়ে গেল চামড়া… সাদা কাগজের মতো: দুই হনুর ওপর জ্বরভাবযুক্ত উত্তপ্ত চক্রাকার দাগ দুটো নিভে গেল আচমকা। ‘নিভে গেল’ শব্দ দুটো ব্যবহার করলাম বিশেষ কারণে। মনে হল, ফুঁ দিয়ে নিভিয়ে দেওয়া হল জ্বলন্ত মোমবাতি। এতক্ষণ দাঁত ঢাকা ছিল ওপরের ঠোঁট ঝুলে থাকায়; অকস্মাৎ কাঁপতে কাঁপতে ওপরের ঠোঁট ওপর দিকে গুটিয়ে যাওয়ায় প্রকট হল দাঁতের সারি। ঝপাৎ করে নীচের চোয়াল ঝুলে পড়ায় বেরিয়ে পড়ল ফুটে ওঠা কালচে জিন্ড। ঘরে যারা উপস্থিত ছিলেন, মৃত্যু দেখে তাঁরা অভ্যস্ত। তা সত্ত্বেও ভালদেমারের ঐ ভয়ানক মুখচ্ছবি দেখে সভয়ে সিঁটিয়ে খাটের পাশে পেছিয়ে গেলেন প্রত্যেকেই।

জানি পাঠকের মনে অবিশ্বাস দানা বাঁধছে। তা সত্ত্বেও যা ঘটেছিল, হুবহু তা বলে যাব।

ভালদেমারের সারা দেহে প্রাণের কোনও লক্ষণ না দেখে আমরা ধরেই নিলাম তিনি মারা গেছেন। সেবিকাদের তদারকির ওপরে তাঁকে ছেড়ে দেওয়াটাই ঠিক মনে করলাম সবাই। ঠিক তখুনি প্রবলভাবে তাঁর জিভটা কেঁপে উঠল। পাক্কা এক মিনিট ধরে সেটা কাঁপল। তারপর হাঁ করে থাকা নিথর চোয়ালের ফাঁক গলে বেরিয়ে এল এক এমন ভয়াবহ কন্ঠস্বর যার বর্ণনা দেওয়ার সাধ্য আমার নেই। সেই শব্দটা কর্কশ, ভাঙাচোরা এবং অদ্ভুত শূন্যতায় ভরা। কী যে বিভীষিকাময় তা! কোনও মানুষের কান কখনো এরকম বিদঘুটে শব্দ শোনেনি, হলফ করে বলতে পারি। অন্তত দুটো কারণে সেটা অপার্থিব বলা চলে। প্রথমত, শব্দটা যেন সুদূর পাতাল থেকে উঠে এসেছে। দ্বিতীয়ত, আঠালো কোনও চটচটে বস্তুর মতোই যেন সেটা।

‘শব্দ’ আর ‘গলার স্বর’-এর কথাই শুধু বললাম এখানে। আরেকটু খোলসা করে বলি। ওই আওয়াজটা প্রকৃতপক্ষে অদ্ভুত একটা কথার কিছু বিশেষ শব্দবন্ধের সমাহার। কয়েক মিনিট আগে ভালদেমারকে প্রশ্ন করেছিলাম, তিনি কি এখনও ঘুমোচ্ছেন? এইবারে তিনি তার জবাব দিচ্ছিলেন-

“হ্যাঁ- না:! ঘুমিয়েছিলাম। কিন্তু-এখন-এখন মারা গেছি।”

শিউরে উঠলাম শব্দ ক’টার বীভৎস উচ্চারণে; কোনও শব্দ যে এমন গায়ের লোম খাড়া করে দিতে পারে, এমন কেটে কেটে মেপে মেপে জিভ দিয়ে বেরিয়ে আসতে পারে, চরম দুঃস্বপ্নেও বোধহয় সেটা অকল্পনীয়। সুতরাং গায়ে যে কাঁটা দিয়েছিল তা কেউই অস্বীকার করতে পারবেন না। এক কথায় বলতে গেলে ওই কথাগুলো আদৌ বলার মতই নয়, কিন্তু তা সত্ত্বেও ওর ভয়াবহ অনুরণনের ধাক্কায় সেই শব্দরা যেন ঠিকরে এসেছিল জিভ থেকে, যেন কবরের অন্ধকার থেকে উঠে আসা কোন বাণী।

ডাক্তারির ছাত্র ‘এল’ তো অজ্ঞানই হয়ে গেলেন। নার্স দুজন ছুটে পালিয়ে গেল ঘর থেকে। কিছুতেই আর তাদের ফিরিয়ে আনা গেল না। আমার অবস্থাটা যে তখন কীরকম সঙ্গিন হয়ে দাঁড়িয়েছিল, সেটা আর পাঠকের কাছে অস্পষ্ট রাখতে চাই না। জ্ঞানবুদ্ধি একেবারে লোপ পেয়েছিল বলা যায়। ঘণ্টাখানেক কারো মুখেই আর একটাও শব্দ বেরোয়নি। এক নাগাড়ে মিস্টার এল-এর জ্ঞান ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চালিয়ে গেছি তার মধ্যে। উনি জ্ঞান ফিরে পাওয়ার পর ভালদেমারের অবস্থা নিয়ে ফের কথাবার্তা শুরু হল।

অবস্থার বর্ণনা আগে যা দিয়েছিলাম, দেখা গেল তার রদবদল হয়নি-ভালদেমার রয়েছেন ঠিক একইভাবে। আয়না ধরলে নিঃশ্বাসের লক্ষণ আর ধরা পড়ছে না-তফাৎ শুধু এইখানে। তাঁর হাত থেকে রক্ত টেনে বার করার চেষ্টা ব্যর্থ হল। আমার ইচ্ছাশক্তি দিয়েও আর সেই হাতকে নাড়াতে পারছিলাম না। বশীকরণের প্রভাব দেখা যাচ্ছিল শুধু ভালদেমারের জিভে। যতবার প্রশ্ন করেছি, ততবার সেই জিভ থরথর করে কেঁপে উঠেছে। যেন কিছু উত্তর দানের আপ্রাণ চেষ্টা করছে -কিন্তু কোনও স্বর ফুটছে না। আমি ছাড়া অন্যরাও প্রশ্ন করে হাল ছেড়ে দিলেন। এমনকি যুগ্ম-সম্মোহনের প্রভাবেও অন্যকে দিয়ে প্রশ্ন করে ফল পাইনি। ভালদেমারের জিভ নিথরই থেকেছে। অন্য নার্সদের জুটিয়ে এনে তাদের জিম্মায় ভালদেমারকে সঁপে দিয়ে দশটা নাগাদ সেই ডাক্তার দুজন আর মিস্টার এল-কে নিয়ে আমি বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলাম।

বিকেলের দিকে আবার সবাই এলাম রোগীকে দেখতে। অবস্থা আগের মতনই রয়েছে। আবার ওঁকে জাগানোর চেষ্টা করে কোনো লাভ নেই, এ বিষয়ে একমত হলাম প্রত্যেকেই। পরিষ্কার দেখা গেল, মৃত্যু বলতে যা বোঝায়, এটা সেটাই। শুধু বশীকরণের  প্রভাবে তাঁকে আটকে রাখা সম্ভব হয়েছে। এ অবস্থায় ওঁকে ফের জাগাতে গেলে মৃত্যুটাই আরও এগিয়ে আসবে। 

সেদিন থেকে এই গত সপ্তাহ পর্যন্ত, টানা সাত মাস একই ভাবে পড়ে থেকেছেন মসিয়ে ভালদেমার। ডাক্তার-বদ্যি ও অন্যান্যরা তাঁকে দেখে এসেছেন মাঝেমধ্যে। নার্সদের তদারকিতেও ছেদ পড়েনি এক মুহূর্ত।

শুক্রবার ঠিক করলাম, আবার ওঁকে জাগানোর চেষ্টা করে দেখি। আগের পরীক্ষাটার ফল ভালো হয়নি যদিও। আড়ালে আবডালে লোকে এসব নিয়ে কানাকানিও শুরু হয়েছে।

বশীকরণ প্রক্রিয়ার নিয়মানুসারে হাত-পা চালিয়ে বেশ কিছুক্ষণ বিফলও হলাম। তারপর দেখা গেল চোখের কণীনিকা ধীরে ধীরে একটুখানি নীচের দিকে নামল। সেই সঙ্গে উৎকট হলদেটে রস বেরিয়ে এল নেমে আসা চোখের তারার আশপাশ দিয়ে।

চেষ্টা করলাম ইচ্ছাশক্তি প্রয়োগ করে ভালদেমারের হাত দুটো আবার চালনা করা যায় কিনা। ব্যর্থ হলাম। ডক্টর এফ-এর ইচ্ছানুসারে তখন একটা প্রশ্ন করলাম:

“মসিয়ে ভালদেমার, এই মুহূর্তে আপনার ইচ্ছে বা অনুভূতি কী ধরনের, বলতে পারবেন?”

মুহূর্তের মধ্যে দুই হনুর ওপর জ্বরের উত্তাপে গোল চাকাচাকা লালচে দাগ জেগে উঠল। জিভটা যেন ভীষণ ভাবে ঘুরপাক খেতে লাগল খোলা মুখের মধ্যে। চোয়াল আর ঠোঁট আগের মতই আড়ষ্ট ছিল বলে এই সাত মাস বিশেষ নড়াচড়া করেনি তারা। তার বেশ কিছুক্ষণ পরে, সেই কর্কশ স্বর তাঁর মুখ থেকে বেরিয়ে এল:

“ভগবানের দিব্যি! একটু জলদি করুন! আমায় ঘুম পাড়িয়ে দিন, না হয় জাগিয়ে দিন! এখুনি! এখুনি! আমি মারা গেছি!”

ভীষণ ঘাবড়ে গেলাম। কিছুক্ষণ হতভম্ব হয়ে বসে রইলাম। তারপর ভালদেমারকে ধাতস্থ করার চেষ্টা করলাম। একেবারেই ব্যর্থ হলাম সেখানে। তাঁকে জাগাতে নিজের ইচ্ছাশক্তি সংহত করে ধস্তাধস্তি করে গেলাম বললেই চলে। লক্ষ্য করলাম, কাজ হচ্ছে তাতে। ভালদেমারের বশীকরণের প্রভাব হয়তো এখুনি কেটে যাবে। ঘরের সব লোক সাগ্রহে চেয়ে রইলেন কী হয় সেটা দেখবার জন্যে।

এরপর যা হয়েছিল, তা এমনই অসম্ভব কাণ্ড যা না দেখলে বিশ্বাস করবে না কেউ। দ্রুত হাত চালিয়ে যাচ্ছি আর ঘোরের মধ্যে শুনে যাচ্ছি এক অদ্ভুত বীভৎস হাহাকার-

‘মারা গেছি! মারা গেছি।’

কথাটা বেরোচ্ছে কিন্তু মুখের মধ্যে ক্রমাগত ঘুরপাক খাওয়া জিভ থেকেই- ঠোঁট থেকে নয়। তারপরেই আচমকা আমার হাতের নিচেই পুরো দেহটা এক মিনিটের মধ্যে কুঁচকে, গুটিয়ে, ছোট্ট হয়ে গুঁড়িয়ে, এক্কেবারে পচেগলে গেল। বিছানা জুড়ে পড়ে রইল শুধু খুবই ঘৃণ্য আর পূতিগন্ধময় খানিকটা তরল পদার্থ।

ছবি অনুবাদক

জয়ঢাকের সমস্ত গল্প ও উপন্যাস

Leave a Reply