এইলেখকের আগের গল্প কৃপণের বামমুঠি, দহনভার, পরবাস, সাভান্ত

লম্বা ফ্লাইটে সময় কাটাবার অনেক উপায় আছে। আজকাল প্রায় সব এয়ারলাইন্সেরই ইন- ফ্লাইট মুভি’র ভাল কলেকশন আছে। সেগুলো দেখা যায়৷ কিম্বা আমার কিন্ডলে বেশ কিছু বই ডাউনলোড করা আছে, সেগুলো পড়া যেতে পারে। কিন্তু এসব কিছু করার আগে মনে হল সেমিনারে যে বিষয় নিয়ে বলব তার উপরে করা প্রেজেন্টেশনটায় আর একবার চোখ বুলিয়ে নি।
ল্যাপটপটা বার করে খুলে বসলাম। ফাইলটা সবে খুলেছি হঠাৎ সামনে চোখ পড়ল। আমাদের রো থেকে কয়েকটা রো আগে এক বৃদ্ধা ভদ্রমহিলা দাঁড়িয়ে আছেন। মাঝে মধ্যে দুপাশে তাকিয়ে কিছু খুঁজছেন। মনে হল উনি বোধহয় নিজের সিট খুঁজে পাচ্ছেন না।
আমার আইল সিট। কিছুক্ষণ দেখার পর উঠে এগিয়ে গেলাম। বৃদ্ধাকে দেখে বাঙ্গালি বলেই মনে হল তাই বাংলাতেই জিগ্যেস করলাম, আপনি কোথায় বসেছিলেন?
বৃদ্ধা’র শীর্ণ রুগ্ন চেহারা, পোষাক- আশাকও সাধারন। একটা সরু কালচে পাড় সাদা শাড়ি পরে আছেন। আমার প্রশ্ন শুনে চোখ তুলে আমাকে দেখলেন। মনে হল এই অচেনা পরিবেশে বাংলা কথা শুনে উনি কিছুটা ভরসা পেয়েছেন। তারপর অসহায় ভাবে বললেন, বুঝতে পারছি না।
প্রশ্ন করলাম, আপনি কি একা এসেছেন? বোর্ডিং পাস কোথায়?
উনি ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়েই রইলেন। মনে হল বোর্ডিং পাস শব্দটার সঙ্গে পরিচিত নন। কিন্তু এই বিশাল প্লেনে সিট নাম্বার না জানলে কিভাবে ওনাকে সাহায্য করব?
জিগ্যেস করলাম, আপনার নাম কী?
এবার ওনার মুখে হাসি ফুটে উঠল। বললেন, সুরবালা, সুরবালা দত্ত।
হাত বাড়িয়ে পাশের সিটের বোতাম টিপে এয়ার হোস্টেসকে ডাকলাম। কেউ আসা অবধি ওখানেই দাঁড়িয়ে রইলাম। কথায় কথায় জানা গেল উনি বহরমপুরে ছেলের কাছে থাকেন। এখন ইউ কে তে ম্যানচেস্টারে মেয়ের কাছে চলেছেন।
ম্যানচেস্টার লন্ডন থেকে গাড়িতে ঘন্টা চারেকের রাস্তা। অনেকবছর আগে একবার গিয়েছিলাম। জিগ্যেস করলাম, এয়ারপোর্টে মেয়েজামাই আপনাকে নিতে আসবে ত?
বৃদ্ধা জানালেন হিথরো থেকে ম্যানচেস্টার উনি প্লেনে যাবেন। মেয়ে বলেছে ঘন্টা খানেকের রাস্তা। ম্যানচেস্টার এয়ারপোর্টে মেয়ে গাড়ি নিয়ে থাকবে।
হিথরো বিশাল এয়ারপোর্ট, ইংরেজি পড়তে বা বলতে না পারলে সাধারণ যাত্রীর পক্ষেই কাস্টমস, ইমিগ্রেশন এসব ঝামেলা সামলে ম্যানেজ করা মুশকিল। সেখানে এই ভদ্রমহিলার হাবভাব দেখে মনে হচ্ছে উনি জীবনে এই প্রথমবার প্লেনে উঠছেন। আশা করি প্লেন বদল করে যেতে কোন সমস্যায় পড়বেননা৷
ইতিমধ্যে এয়ারহোস্টেস এসে গেল। আমি সংক্ষেপে ব্যাপারটা বুঝিয়ে দিলাম৷ মেয়েটি মিষ্টি হেসে বলল, ওকে স্যার, আই উইল টেক কেয়ার ।
নিজের সিটে ফিরে এলাম। একটু পরে দেখি মেয়েটি ওনাকে আমার সিট থেকে পাঁচটা ছটা রো পিছনে আর একটা এইল সিটে নিয়ে বসাচ্ছে৷ কিছুটা নিশ্চিন্ত হয়ে ল্যাপটপ খুলে কাজে মন দিলাম। তবে মনের মধ্যে একটা খচখচানি রয়েই গেল৷
একটু পরে এয়ারহোস্টেস খাবার নিয়ে এল। ব্রেড, আমলেট আর সসেজ।সাথে কিছু ফল। খাওয়া শুরু করার আগে কি মনে হল, উঠে পিছনে বৃদ্ধার কাছে গেলাম। দেখি উনি খাবার ট্রে থেকে ফয়েলটা সরিয়েছেন, কিন্তু খাচ্ছেন না। আমাকে দেখে চোখ তুলে তাকালেন । বললাম, খাচ্ছেন না ?
বৃদ্ধা আমতা আমতা করে বললেন, আমি বিধবা মানুষ বাবা, নিরামিষ ছাড়া কিছু খাই না।
এয়ারহোস্টেস খাবার দেবার আগে নিশ্চয়ই ওনাকে জিগ্যেস করেছিল, উনি বোধহয় বুঝতে পারেন নি। এয়ারহোস্টেসরা এখন খাবার দিতে ব্যস্ত, ডেকে লাভ নেই। অগত্যা দাঁড়িয়ে রইলাম। বেশ কিছুক্ষণ পরে একটি মেয়ে ট্রলি নিয়ে ফেরত এল। তাকে ব্যাপারটা বলতে সে বিরক্তমুখে ট্রেটা তুলে নিয়ে ট্রলি থেকে একটা ভেজ লেখা প্যাকেট বার করে দিল। সেটা খুলে দেখে বৃদ্ধার মুখে হাসি ফুটল। আমি ফিরে এলাম। ভদ্রমহিলার না দেখা ছেলের উপর একটু একটু রাগ হচ্ছিল। বয়স্কা মা’কে এভাবে কেউ একা একা প্লেনে তুলে দেয়?
খাওয়া শেষ করলাম। এয়ারহোস্টেস এসে ট্রেটা নিয়ে গেল। এখনও দীর্ঘ পথ বাকি। কয়েকঘন্টা পর আবার খাবার দেবে। একটু ঘুমিয়ে নেওয়া যেতে পারে।
সীটটা পিছনে হেলিয়ে দিয়ে সবে চোখ বুজেছি, মনে হল কেউ পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। চোখ খুলে দেখি সেই বৃদ্ধা। তাড়াতাড়ি উঠে বসলাম। বললাম, কিছু বলবেন?
উনি একটু ইতস্তত করে বললেন, তুমি কোথায় যাবে বাবা?
বললাম লন্ডনেই।
উনি আবার একটু দ্বিধার সঙ্গে বললেন, তুমি আমাকে প্লেনে তুলে দেবে? সেখানে আমার মেয়ে থাকবে।
মুশকিলে পড়লাম। ।. ইউনিভার্সিটি থেকে এক ভদ্রলোক আমাকে নিতে আসবেন।বৃদ্ধার ফ্লাইট কটায় জানিনা। ততক্ষণ ভদ্রলোককে অপেক্ষা করতে বলা যায়না। কিন্তু অসহায় বৃদ্ধাকে ছেড়ে যেতেও মন চাইছেনা। অগত্যা ঠিক করলাম, হিথরোয় নেমে ইউনির ভদ্রলোককে চলে যেতে বলব। আমি না হয় ট্যাক্সি নিয়ে চলে যাব।
বললাম, চিন্তা করবেন না মাসীমা, আমি আপনাকে তুলে দিয়ে যাব।
বৃদ্ধার মুখচোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। আবার জোর দিয়ে বললেন, ওখানে আমার মেয়ে থাকবে।
আরও দু চারটে কথা হল। বৃদ্ধার মেয়ে জামাই দুজনেই ম্যানচেস্টারে .চাকরি করে। কিছুদিন আগে একটি ফুটফুটে নাতনি হয়েছে। তাকে দেখার জন্য ভদ্রমহিলা উৎসুক হয়ে আছেন। এখন বেশ কিছুদিন ওখানেই থাকবেন।
উনি ফিরে গেলেন আর ঘুম আসবেনা। অগত্যা কিন্ডলটা বার করে একটা বই পড়তে শুরু করলাম।
পড়তে পড়তে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি খেয়াল নেই৷ ঘুম ভাঙতে দেখি অনেকক্ষণ ঘুমিয়েছি। ঘড়ি দেখাচ্ছে প্রায় চার ঘন্টা কেটে গেছে । হিসেব করে দেখলাম আর ঘন্টা দুয়েক বাকি। প্রায় মেরে এনেছি।
একটু পরে আর একপ্রস্থ খাবার দেওয়া শুরু হল। একটু পরে এয়ারহোস্টেস আমাদের সিটে ট্রলি নিয়ে এল। আগের সেই মেয়েটিই। খুব একটা খিদে হচ্ছিল না তবু সময় কাটান’র জন্যই ট্রে’টা নিলাম৷ নেবার সময় মেয়েটিকে পিছনে হাত দেখিয়ে বললাম, সিট নাম্বার ৪২ সি, অনলি ভেজ।
মেয়েটি এবার হেসে বলল, ইয়েস, আই রিমেম্বার।
এবারে হাল্কা খাবার। একটুকরো কেক, কুকিজ আর জুস৷ খাওয়া শেষ করে বৃদ্ধার খোঁজ নিতে গিয়ে দেখি উনি ঘুমিয়েই আছেন। সামনের ট্রেতে ভেজ লেখা খাবারের প্যাকেটটা রাখা। বোধহয় ওনাকে ঘুমিয়ে থাকতে দেখে মেয়েটি আর ডাকেনি।
বৃদ্ধাকে আর একবার কাছ থেকে দেখলাম। বলিরেখায় ভর্তি মুখ, গাল গর্তে বসা। ঘোলাটে চোখ। মনে হল সত্তরের কোঠায় বয়েস হবে৷ শীর্ণ মুখেও কেমন যেন একটা সারল্য আছে৷ বড় মায়া হল। এই বয়েসে চেনা- পরিচিত গন্ডী ছেড়ে বিদেশ বিভুঁইতে গিয়ে কেমন থাকবেন কে জানে। গায়ের উপর কম্বলটা সরে গেছিল, ভাল করে টেনে দিলাম।
সীটে ফিরে গেলাম। একটু পরেই সীটবেল্ট আটকানর সঙ্কেত জ্বলে উঠল। পাইলট ঘোষণা করলেন কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা হিথরো এয়ারপোর্টে নামতে চলেছি।
হিথরোতে প্লেন থামতে বৃদ্ধাকে সাথে নিয়েই নামলাম। ইমিগ্রেশন কাউন্টারের সামনে সর্পিল লম্বা লাইন। দুজনে দাঁড়ালাম। লাইন এগোতে থাকল। মিনিট কুড়ি পর আমাদের পালা এল। বৃদ্ধাকে এগিয়ে দিয়ে আমিও সাথে গেলান। কাউন্টারে বসে থাকা অফিসারটিকে বললাম, ইনি ইংরেজি বলতে পারেন না। আমি কি এঁর দোভাষীর কাজ করতে পারি?
রাশভারী চেহারার অফিসার একবার আমাদের দেখে নিয়ে গম্ভীর ভাবে বললেন, ওকে।
উনি বৃদ্ধার পাসপোর্ট চেক করলেন। তারপর মামুলি দু-চারটে প্রশ্ন করলেন। উত্তর দিলাম। উনি সন্তুষ্ট হয়ে পাসপোর্টে ছাপ মেরে এগিয়ে দিলেন। বৃদ্ধাকে এগিয়ে গিয়ে অপেক্ষা করতে বলে আমি এবার নিজের পাসপোর্টটা এগিয়ে দিলাম। সেটাও হয়ে গেল।
এবার কনভেয়র বেল্ট থেকে লাগেজ তোলার পর্ব। আমার ছোট স্যুটকেসটা প্রথমদিকেই এসে গেল। বৃদ্ধারটা আর আসেনা। অনেকক্ষণ অপেক্ষা করার পর দেখি কনভেয়র বেল্টে ধাক্কা খেতে খেতে একটা রঙচটা পুরান স্যুটকেস এগিয়ে আসছে। বৃদ্ধা দূর থেকে দেখেই বললেন, ওই ত আমারটা আসছে৷
তুলে নিলাম৷ একটা ট্রলিতে দুটো স্যুটকেসই চাপালাম। এবার বৃদ্ধাকে তুলে দিতে ডোমেস্টিক টার্মিনালে যেতে হবে। সামনে ডিসপ্লে সাইন দেখে ট্রলি ঠেলে হাঁটতে থাকলাম। বৃদ্ধা পেছনে আসছেন।
বৃদ্ধার ফ্লাইটের জন্য নতুন করে চেক ইন করতে হল। ওনার লাগেজ জমা করে দিলাম। এবারে সিকিওরিটি চেক। এখানে আমি যেতে পারবনা। গেটের সামনে দাঁড়ালাম। একটু পরে একটি মেয়ে এল। পোষাক দেখে মনে হল বৃদ্ধা যে এয়ারলাইন্সে যাবেন তারই হোস্টেস। এগিয়ে গিয়ে আলাপ করলাম। সমস্যাটা বুঝিয়ে বললাম। মেয়েটি ভাল, সব শুনে বলল, ওকে, আই শ্যাল ট্রাই টু হেল্প হার।
বৃদ্ধার কাছ থেকে এবার বিদায় নিলাম। পকেট থেকে নিজের একটা কার্ড বার করে পিছনে আমার লন্ডনের ফোন নম্বর লিখে দিয়ে বললাম, মেয়েকে বলবেন একটা ফোন করতে।
বৃদ্ধা ঘাড় নাড়লেন।
লন্ডনে পৌঁছে কয়েকটা দিন সেমিনার নিয়ে ব্যস্ত রইলাম। ভাল ভাবে মিটেও গেল।আমার ভাষণ ইন্টারনেটে লাইভ স্ট্রিম করা হয়েছিল । তার পর বিভিন্ন দেশের গবেষক ও ছাত্রছাত্রীদের কাছ থেকে অনেক প্রশ্ন এসেছিল। ই মেলে সেগুলোর উত্তর দিতে একটা দিন লাগল। তারপর হাতে বিশেষ কাজ নেই। ফেরার টিকিট আরও কয়েক দিন পরে। লন্ডন ও তার আশেপাশের জায়গাগুলি আমার অনেকবার ঘোরা, অতএব হোটেলের ঘরে বসে পড়াশুনো করেই সময় কাটাচ্ছি।
এর মধ্যেই একদিন রাতে একটা অচেনা নম্বর থেকে ফোন এল। ফোনটা ধরতে এক মহিলা প্রথমে ইংরেজিতে আমার নাম জিগ্যেস করলেন। তারপর বাংলায় বললেন আমি মেয়ে বলছি ম্যানচেস্টার থেকে। আমার মায়ের সঙ্গে আপনার প্লেনে আলাপ হয়েছিল।
যাক, তাহলে বৃদ্ধা ঠিকমতই পৌঁছেছেন। জিগ্যেস করলাম, উনি কেমন আছেন?
মহিলা বললেন, ধরুন, উনি আপনার সঙ্গে কথা বলবেন।
কয়েক মুহূর্ত পরে বৃদ্ধা লাইনে এলেন। কাঁপা গলায় বললেন, কেমন আছ বাবা?
হেসে বললাম, ভাল আছি। আপনি কেমন আছেন?
বৃদ্ধা বললেন, ভাল আছি।
তারপর চুপ করে গেলেন। আমি বললাম, আপনার নাতনি কেমন আছে?
বৃদ্ধা এবার হাসলেন, বললেন, খুব দুষ্টু হয়েছে৷ এই কদিনেই আমার খুব ন্যাওটা হয়েছে।
তারপর আবার চুপ। তারপর হঠাৎই বললেন, তুমি ত হোটেলে মোটেলে খাও, আমার এখানে একদিন আসবে? তোমাকে দুটো মাছের ঝোল ভাত রান্না করে খাওয়াতাম।
মুশকিলে পড়ে গেলাম।ম্যানচেস্টার প্লেনে গেলে বেশ কিছু পাউন্ডের ব্যাপার। রেন্টাল কার নিয়ে ড্রাইভ করে গেলে কিছুটা সস্তা পড়বে, তবে অনেক সময় লাগবে৷ কিন্তু বৃদ্ধা এমন আন্তরিক ভাবে বলছেন সরাসরি না ও বলা যায় না৷
বললাম, দেখছি। আসলে আর কয়েকটা দিনই আছি। কিছু কাজও আছে।
বৃদ্ধা আরও দু-একবার অনুরোধ উপরোধ করে বললেন, মেয়েকে দিচ্ছি। ওর কাছ থেকে বাসার ঠিকানাটা বুঝে নাও।
বৃদ্ধা ধরেই নিয়েছেন আমি আসব। মেয়েও লাইনে এসে বললেন, আপনি এলে খুব খুশী হব। তারপর ঠিকানাটা বুঝিয়ে দিলেন।
ফোনটা রেখে একটু ভাবলাম। গুগল ম্যাপে দেখছি আমার হোটেল থেকে ম্যানচেষ্টার যেতে চারঘন্টা মত লাগবে। হাতে কাজও বিশেষ নেই। ইংল্যান্ডের বিখ্যাত কান্ট্রিসাইডের মধ্য দিয়ে লং ড্রাইভটাও মন্দ লাগবেনা৷ তাছাড়া সত্যি বলতে কি বৃদ্ধা মেয়ের বাড়িতে নতুন পরিবেশে কি রকম মানিয়ে নিয়েছেন সেটা দেখার জন্য একটা চিন্তা বা কৌতুহল মনের মধ্যে ছিলই।
ঠিক করলাম ঘুরেই আসি। আজ রাত হয়ে গেছে। এত তাড়াতাড়ি সব ব্যবস্থা করে কাল যাওয়া একটু মুশকিল। বৃদ্ধার মেয়েকে মেসেজ করে দিলাম পর্শু সকালে যাব। ব্রেকফাস্ট করে বেরলে পোঁছাতে পৌঁছাতে দুপুর হয়ে যাবে৷ দেখা সাক্ষাৎ করে আবার বিকেল বিকেল বেরিয়ে রাতের মধ্যে ফিরে আসব। কার রেন্টাল এজেন্সিতে ফোন করে একটা গাড়ি বুক করলাম।
পর্শু সকালে আটটা নাগাদ বেরিয়ে পড়লাম। লন্ডন শহরের যান-জট আর ভীড়-ভাট্টা পেরিয়ে হাইওয়েতে পড়তে আধা ঘন্টা মত লাগল। তারপর মসৃণ চওড়া রাস্তা, অনায়াসে একশর উপরে স্পিড তুলে দিলাম। দুপাশে ছবির মত সবুজ প্রান্তর। মাঝে মধ্যে ছোট ছোট গ্রাম বা জনপদ ভেসে উঠে আবার পিছনে মিলিয়ে যাচ্ছে। বেশ উপভোগ্য সফর ।
ম্যানচেস্টারে পৌঁছলাম বারোটা নাগাদ। বাড়িটা খুঁজে পেতে বিশেষ অসুবিধা হলনা৷ সামনের রাস্তায় দেখলাম অনেক গাড়ি পার্ক করা আছে। সেখানেই গাড়িটা রাখলাম। গেট খুলে দু ধাপ উঠে বেল বাজানর পর আমাকে কিছুটা বিস্মিত করে বৃদ্ধা নিজেই দরজা খুললেন৷ আমাকে দেখে শীর্ণ চোখমুখ উজ্জল হয়ে উঠল। একগাল হেসে বললেন এসো বাবা।,
ঘরে ঢুকে জুতো ছাড়তে ছাড়তে বললাম, আপনার মেয়ে?
বৃদ্ধা বললেন, ও ত স্কুলে গেছে। বিকেলে ফিরবে৷
বৃদ্ধা আমাকে বাইরের ঘরে বসিয়ে বললেন, চা খাবে বাবা?
এতটা রাস্তা ড্রাইভ করে এসে একটু চা খেলে মন্দ হত না। মাথা নাড়লাম।
বৃদ্ধা কিচেনে চলে গেলেন। চায়ের জল বসিয়ে শোবার ঘর থেকে একটি মিষ্টি ফুটফুটে বাচ্চাকে কোলে করে নিয়ে এসে বললেন, দ্যাখো বাবা, আমার নাতনি।
বাচ্চাটা জুলজুল করে আমাকে দেখছে। উঠে গিয়ে গাল টিপে একটু আদর করে দিয়ে বললাম, তা হলে একে নিয়েই আপনার সময় কাটছে?
বৃদ্ধা হেসে বললেন, মেয়ে জামাই সকালে বেরিয়ে যায়। মেয়ে ফেরে বিকেলে। জামাই আরও পরে। সারা দিন আমার কাছেই থাকে।
বৃদ্ধা বাচ্চাটিকে কয়েকটা খেলনা দিয়ে আমার সামনে কার্পেটে বসিয়ে দিলেন। ও আপন মনে খেলতে লাগল। বৃদ্ধা চা আনতে গেলেন।
চা খেতে খেতে আরও কথা হল। জানলাম বৃদ্ধার মেয়ে স্কুল টিচার। জামাই একটি কনসাল্ট্যান্সি ফার্মে কাজ করে। মেয়ে এতদিন মেটারনিটি লিভে ছিল। বৃদ্ধা আসার পর আবার জয়েন করেছে। মেয়ে সকাল সাতটা নাগাদ বেরিয়ে যায়। ফেরে বিকেল চারটে নাগাদ। ততক্ষণ নাতনি বৃদ্ধার কাছেই থাকে। উনি ওর দেখাশুনো করার ফাঁকে ফাঁকে নিজের নিরামিষ রান্নাটাও করে নেন। দুপুরে খেয়ে দেয়ে একফাঁকে বাসনও মেজে রাখেন। ডিশওয়াশার, ভ্যাকুয়াম ক্লিনার সবই আছে তবে সেসব কাজ মেয়ে বাড়ি ফিরে করে। বৃদ্ধা ওসব চালাতে জানেন না।
শুনে খটকা লাগল। তাহলে কি বাচ্চার দেখাশুনো করার জন্যই এত খাতির করে বৃদ্ধাকে দেশ থেকে আনান হয়েছে! এদেশে বেবি সিটারের খরচ সাঙ্ঘাতিক। তাও আবার সারাদিনের জন্য।
বৃদ্ধা হেসে বললেন, আমার নাতনি ভয়ানক দুষ্টু। সারাদিন একটুও ঘুমোয়না। সবসময় ওর সঙ্গে খেলতে হবে। অতি কষ্টে রান্নাবান্না করি।
চা খাওয়া হয়ে গেছিল। কাপটা টেবিলে নামিয়ে রেখে বললাম, কতদিন থাকবেন মেয়ের কাছে?
বৃদ্ধা বললেন থাকব যতদিন হয়। আমার ভিসা একবছরের। জামাই বলেছে আরও বাড়ান যাবে।
জিগ্যেস করলাম বহরমপুরে আপনার ছেলের বাড়িতে কে কে আছেন? নাতি নাতনি কটি?
বৃদ্ধার মুখে আবার হাসি ফুটে উঠল। বললেন, এক নাতি, সে বড় হয়ে গেছে। ক্লাস এইটে পড়ে। দাঁড়াও তোমাকে ছবি দেখাই।
বৃদ্ধা উঠে বোধহয় ওনার স্যুটকেস থেকে একটা পোস্টকার্ড সাইজের ছবি নিয়ে এসে আমাকে দেখালেন। একটি বছর দশেকের ছেলের সঙ্গে বৃদ্ধার ছবি৷ ছেলেটির উজ্জ্বল বুদ্ধিদীপ্ত চেহারা। তবে মনে হল কয়েক বছর আগে তোলা।
বললাম, এতদিন নাতিকে ছেড়ে থাকবেন, মন খারাপ হবে না?
বৃদ্ধা চুপ করে গিয়ে বললেন, তা একটু হবে। তবে কি জান ত বাবা, ছেলের বাড়িতে জায়গা কম। ছোট দুটি ঘর। লোকজন এলে অসুবিধা। তাছাড়া নাতিটাও বড় হচ্ছে, ওর পড়াশুনোর জন্য আলাদা ঘর দরকার।
তারপর নিজের মনেই বললেন, ফোনে কথা হবে৷ আজকাল ছবিও দেখা যায়।
একটু পরে বললেন, চলো বাবা খেয়ে নাও।
বৃদ্ধা রান্নাঘর থেকে খাবার দাবার এনে ডাইনিং টেবিলে রাখলেন।উঠে গিয়ে বেসিনে হাত ধুয়ে খেতে বসলাম। বৃদ্ধা যত্ন করে বেড়ে দিলেন। একেবারে ঘরোয়া বাঙ্গালি রান্না৷ আজকাল বিদেশে সবই পাওয়া যায়৷ বৃদ্ধার রান্নার হাতটি ভাল, পুরান দিনের মত। তৃপ্তি করে খেলাম। খাবার পর বৃদ্ধা একটা ছোট প্লেটে করে মুখশুদ্ধিও নিয়ে এলেন৷
খেয়ে দেয়ে আবার সোফায় এসে বসলাম। বৃদ্ধা নাতনিকে ঘুম পাড়াতে ভিতরে গেলেন। একটু পরে ফিরে এলেন। আরও অনেক কথা হল। উনি আমার ছেলে মেয়ের খোঁজ নিলেন, ছবি দেখতে চাইলেন। মোবাইলে দেখালাম।
কথায় কথায় কখন যে সময় কেটে গেছে খেয়াল ছিলনা। হঠাৎ ঘড়ির দিকে চোখ পড়তে দেখি চারটে বাজে। এবার বেরিয়ে পড়া উচিত, নয়ত অনেক রাত হয়ে যাবে।
উঠে দাঁড়িয়ে বললাম,মাসিমা, এবার যেতে হবে।
বৃদ্ধা ম্লান হেসে বললেন, তুমি কষ্ট করে এতদূরে এলে, খুব ভাল লাগল। আবার এলে এসো।
বললাম, আসব।
বৃদ্ধা দরজায় এসে দাঁড়ালেন। আমি আর একবার ওনার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে গেট খুলে গাড়িতে গিয়ে বসলাম। গাড়ি স্টার্ট করে জানালার কাঁচ নামিয়ে দিলাম। দেখি বৃদ্ধা হাসিমুখে দরজার ফ্রেমে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। বিকেলের আলো এসে পড়েছে গায়েমুখে।
আর কোনদিন দেখা হবে বলে মনে হয়না। আমি আমার অধ্যাপনার জগতে ফিরে যাব। উনি মেয়ের সংসারে নাতনির দেখাশুনো করতে ব্যস্ত থাকবেন। মনে মনে বললাম, ভাল থাকবেন মাসীমা।
গাড়ির রিয়ার ভিউ মিররে হাস্যময়ী বৃদ্ধার ছবি ক্রমশ ছোট হতে হতে একসময় মিলিয়ে গেল।
সামনে অনেকটা রাস্তা। অ্যাকসিলারেটরের প্যাডলে পা দিলাম।
অলঙ্করণ- প্রত্যূষ লালা
জয়ঢাকের গল্পঘর
গল্পটি লেখকের কুড়িটি কিশোর কাহিনির সঙ্কলন ‘ভয়ের ভাক্সিন” নামের বই থেকে থেকে নেয়া। বইটি সম্বন্ধে জানতে ও জয়ঢাক প্রকাশনের বুকস্টোর থেকে অর্ডার দিতে নীচের ছবিতে ক্লিক করুন
