এইলেখকের আগের গল্প কৃপণের বামমুঠি, দহনভার, পরবাস, সাভান্ত, ছিন্নমূল

মসৃণ হাইওয়ে দিয়ে গাড়ি ছুটে চলেছে। বিনির বাবা এমনিতে সাবধানে চালান, শহরের বাইরে এসে ফাঁকা রাস্তা পেয়ে স্পিড তুলে দিয়েছেন। এখন প্রায় আটটা বাজে, রোদ উঠবে উঠবে করছে। বাবা এখনও এসি চালাননি, জানালার কাঁচ আর্ধেক নামানও, হু হু করে হাওয়া আসছে। তাতে ভোরের মিষ্টি সবুজ গন্ধ এখনও লেগে রয়েছে। বিনি বাবার পাশে বসে সেটা উপভোগ করছে। মা পিছনের সিটে বসে টুকটাক দু-একটা কথা বলছেন। বিনির একটু একটু খিদে পাচ্ছে। সাড়ে আটটা নাগাদ একটা জায়গায় পৌঁছে তাদের ব্রেকফাস্ট করার কথা।
বাবা হঠাৎ গাড়ির গতি কমিয়ে দিয়ে গাড়িটা রাস্তার পাশে নিয়ে এলেন। সামনে ছোটো মতন একটা চায়ের দোকান দেখা যাচ্ছে। পাশে তোলা উনুনে বড়ো কড়াইতে সোনালি রঙের কিছু ভাজা হচ্ছে। বোধ হয় আলুর চপ। ইস, কলকাতার বাইরে এইসব তেলেভাজার স্বাদ কেমন আলাদা হয়।
মা অবাক হয়ে বললেন, “কী হল, এখানে আবার দাঁড় করালে কেন?”
বাবা পিছনে ঘুরে হাসিমুখে বললেন, “হাইওয়ের ধারে বসে একটু চা-টা হবে না?”
বিনির মন নেচে উঠল। সে দরজা খুলে প্রায় লাফ দিয়ে নামল।
মাও নেমেছেন। মুখে হালকা বিরক্তির ছাপ। বললেন, “বিনি খালি চা আর বিস্কুট খাবে। এইসব জায়গায় ভাজাভুজি একদম নয়।”
বিনি একটু দমে গিয়ে আড়চোখে বাবার দিকে তাকাল। তিনি মায়ের চোখ বাঁচিয়ে একটা ইশারা করলেন, মানে কিছু একটা ব্যবস্থা হবে। বিনি স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল।
তিনজনে মিলে দোকানের বাইরে একটা কাঠের বেঞ্চে বসলেন। বাবা মাঝখানে। তিনি মায়ের দিকে ঝুঁকে পড়ে হাসিমুখে মৃদু গলায় কথা বলতে লাগলেন। বিনি দেখল, মায়ের মুখে বিস্ময়, বিরক্তি এবং সবশেষে হাল ছেড়ে দেওয়ার ভাব ফুটে উঠল। বাবা হাসিমুখে উঠে দোকানের কাউন্টারে গেলেন। একটু পরে দু-হাতে দুটো ঠোঙা নিয়ে ফিরলেন—একটা মুড়ির ঠোঙা, উপরে একটা কাঁচা লংকা গোঁজা। অন্যটা আলুর চপ। দোকানের ছেলেটি এসে একটা বড়ো থালা দিয়ে গেল। বাবা তাতে মুড়ি ঢেলে দিলেন, আর ঠোঙা থেকে তিনটে আলুর চপ বার করে সাজিয়ে রাখলেন। বিনির জিভে জল আসছিল, সে সুরুৎ করে গিলে নিল।
বাবা একমুঠো মুড়ি আর একটা চপ তুলে নিয়ে বললেন, “দেখছিস কী, শুরু কর!”
গরম আলুর চপে এক কামড় দিয়ে বিনি আরামে চোখ বন্ধ করে ফেলল। তার মনে হল, এত ভালো আলুর চপ সে কোথাও খায়নি। বাইরেটা যেমন মচমচে, পুরটা তেমনি টাটকা, ঝাল ঝাল আর মশলার গন্ধে ভরা। সে চপের টুকরোটা গিলে না ফেলে জিভ দিয়ে মুখের চারদিকে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে স্বাদ নিতে লাগল।
বাবা খেতে খেতে মাঝেমধ্যে কাঁচা লংকায় কামড় দিচ্ছেন আর ঝালের চোটে হুসহাস করে শব্দ করছেন। মা নিশব্দে খাচ্ছেন।
একটা চপ শেষ করে বিনি সতৃষ্ণ নয়নে ঠোঙাটার দিকে তাকাতে লাগল। এই জিনিস একটা খেয়ে চলে যাবার মানে হয় না। কিন্তু মা কি তাকে আর একটা খেতে দেবেন?
বাবা খেতে খেতে তাকে দেখছিলেন। তিনি ঠোঙা খুলে বাকি দুটো চপ বার করলেন। তারপর মা কিছু বলার আগেই চট করে একটা বিনির হাতে দিয়ে বললেন, “এই নে, তুই একটা, আমি একটা।”
বিনি কৃতজ্ঞ দৃষ্টিতে বাবার দিকে তাকাল।
মা অবশ্য মোটেই খুশি হননি৷ রাগত স্বরে বললেন, “লোভী মেয়েকে খাইয়ে যাচ্ছ, ওখানে গিয়ে পেট ছাড়লে নিজে সামলাবে।”
বাবা অপরাধীর মতো মুখ করে বসে রইলেন। বিনি অবশ্য এসব ছোটোখাটো ব্যাপার গায়ে মাখে না। সে মহানন্দে দ্বিতীয় চপে কামড় দিল।
আলুর চপ পর্ব শেষ করে ছোটো কাগজের গ্লাসে চা খেয়ে তারা আবার রওনা দিল। বিনি বাবার কাছ থেকে মোবাইল চেয়ে নিয়ে ম্যাপে দেখল, এখান থেকে প্রায় দু-ঘণ্টা।
এইখানে গল্প থামিয়ে বিনির পরিচয় দেওয়া যেতে পারে। বিনির ভালো নাম অপরাজিতা, সে দক্ষিণ কলকাতার একটি নামি স্কুলে ক্লাস সেভেনে পড়ে৷ লেক-কালীবাড়ির কাছে একটি বহুতল আবাসনে বাবা, মা আর দাদার সঙ্গে থাকে। সে পড়াশুনোয় ভালো, ক্লাসে উপরের দিকে থাকে। ভালো টিটি খেলে আর আর্চির কমিক্স পড়তে ভালোবাসে। তার বন্ধুদের অনেকের মোবাইল থাকলেও তাকে এখনও দেওয়া হয়নি৷ বাবা বলেছেন, এবারে ক্লাসে প্রথম তিনজনের মধ্যে থাকতে পারলে তাকে মোবাইল কিনে দেওয়া হবে। সে তাই মন দিয়ে পড়াশুনো করছে। এছাড়া সে একটু খেতে-টেতে ভালোবাসে। কলকাতার রাস্তাঘাটে, মিষ্টির দোকানে আর ছোটোবড়ো রেস্তোরাঁয় যে কত রকমারি খাবার পাওয়া যায়—সে কোনটা ছেড়ে কোনটার নাম করবে? তবে সমস্যা হল, মা পেটখারাপ হবে বলে বাইরের খাবার তাকে বেশি খেতে দেন না। টিফিনেও পয়সা না দিয়ে তাকে বাড়ি থেকে টিফিন দিয়ে দেন।
সে-খাবার বিনির মোটেই ভালো লাগে না। বাবা অবশ্য মাঝে-মাঝেই অফিস থেকে ফেরার সময় তার জন্য খাবার-টাবার নিয়ে আসেন। ক’দিন আগে এনেছিলেন নকুড়ের সন্দেশ। এটা বিনি আগে খায়নি। এক কামড় দিয়ে মনে হয়েছিল ঠোঁটের কোনা দিয়ে একটুকরো স্বর্গ যেন গড়িয়ে নামছে। কিন্তু বেশি লিখতে গেলে মহাভারত হয়ে যাবে।
গন্তব্যে পৌঁছতে পৌঁছতে এগারটা বাজল। শেষদিকে বিনি ঘুমিয়ে পড়েছিল, একেবারে হোটেলে পৌঁছে মা তাকে ডেকে তুললেন। বাবা যখন রিসেপশনে নাম-টাম ইত্যাদি লিখছেন, সে মাকে একরকম টানতে টানতে নিয়ে বাইরেটা দেখতে গেল। হোটেলের গেটের বাইরে এসেই সে অবাক হয়ে গেল। এখন ভাটার সময়, তবু যেন কয়েক হাত দূরেই সমুদ্র। স্লেট রঙের চাদরের মতো বিছিয়ে আছে। মাও অবাক হয়ে গেছেন। বললেন, “জোয়ারের সময় তো সমুদ্রের জল হোটেলের ঘরে ঢুকে পড়বে।”
দৃশ্যটা কল্পনা করে বিনির খুব মজা লাগল। সত্যিই যদি এমন হয়, সে ছুটির পর স্কুলে বন্ধুদের জমিয়ে গল্প বলতে পারবে।
তারা হোটেলে ফিরে এল। বাবা ততক্ষণে মোটামুটি গুছিয়ে নিয়েছেন। ঘরটা ভালো—একটা ডাবল, আর একটা সিঙ্গল বেড পাতার পরেও বেশ কিছুটা জায়গা আছে। একটা ব্যালকনিও আছে যেখান থেকে সমুদ্র দেখা যায়। বিনি খুশি হয়ে উঠল।
তারা সবাই স্নান করেই বেরিয়েছে, তবু মা বললেন, এতটা পথ এসেছে, আর একবার করে নিতে। বিনি বলল সে পরে যাবে। সে বাবার মোবাইল চেয়ে নিয়ে তার প্রিয় বন্ধু সুমিতার সঙ্গে চ্যাট করতে লাগল। মা স্নান করতে গেলেন। বাবা রিসেপশনে ফোন করে খবরের কাগজ আনিয়ে পড়তে লাগলেন আর মাঝেমধ্যে সেরকম খবর হলে বিনিকে পড়ে শুনিয়ে আর বুঝিয়ে দিতে লাগলেন। বাবা এটা প্রতি রবিবার করেন। উনি বলেন, ছোটবেলা থেকেই চারপাশে কী হচ্ছে তা জানা উচিত। বিনির শুনতে খারাপ লাগে না।
সকলের স্নানপর্ব সারতে সারতে প্রায় সাড়ে বারোটা বাজল। তারপর তারা হোটেলের ডাইনিং হলে খেতে গেল। হল প্রায় ফাঁকা। হয়তো বাকিরা পরে আসবেন বা বাইরে খেতে যাবেন। তারা খেল ডাল ফ্রাই, একটা ভাজা ও চিকেন কারি। বেশ ভালো রান্না। কিন্তু বিনির ঠিক মন ভরল না। তার এরকম অভিজাত জায়গায় সাজানো খাবার থেকে কোনও সস্তার হোটেলে ভাঙা কাঠের চেয়ারে বসে ধোঁয়া-ওঠা ভাত আর কাঁচা লংকা, পেঁয়াজ দিয়ে গরম গরম মুরগির ঝোল খেতে বেশি ভালো লাগে। ঝোল চাইলে দোকানের লোক এসে ডেকচির তলা থেকে এক হাতা ঢেলে দিয়ে যায়, তাতে দু-এক কুচি মাংসও থাকে। সে আর এক মজা।
বাবাকে চুপিচুপি বলতে তিনি হেসে বললেল, “কাল হবে।”
মা কিছু একটা প্ল্যান হচ্ছে বুঝতে পেরে কটমট করে তাকিয়ে রইলেন।
সন্ধ্যা ছ’টা নাগাদ তারা বেরোল।
সান-সেটের পরেও অনেকক্ষণ চারদিকে একটা নীলচে আলো ছড়িয়ে থাকে, তখন বিচে হাঁটতে খুব ভালো লাগে। এখানে অবশ্য দিঘার মতো প্রশস্ত বিচ নেই, তবু কাছ দিয়ে হাঁটা যায়। বিচে অনেক খাবার—ফুচকা, ঝালমুড়ি, আলুকাবলি—কী নেই? বিনি জুলজুল করে তাকাচ্ছে বটে, কিন্তু সে জানে, মা ওদের ধারেকাছেও ঘেঁষতে দেবেন না। তাই সে চুপ করে আছে। বাবা মাঝেমধ্যে আড়চোখে তাকে দেখছেন আর মুচকি হাসছেন।
বিচের প্রায় শেষে দরমার বেড়া দিয়ে চারদিক ঘেরা একটা জায়গা, উপরে নীল প্লাস্টিকের চাদর বিছিয়ে শক্ত করে বাঁধা। তারই সামনে বড়ো তোলা উনুনে বিশাল কড়াইতে শিঙারা ভাজা হচ্ছে। দূর থেকেও সমুদ্রের নোনা গন্ধ ছাপিয়ে টাটকা শিঙাড়ার সুগন্ধ আসছে। বাবা আর একটু এগোলেন। তারপর হাসিমুখে মায়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, “এটা কি চলতে পারে?”
মায়ের মুখ বরাবরের মতোই গম্ভীর, তবু বিনির মনে হল, ছোটো একচিলতে হাসি ঝিলিক দিয়ে উঠে মিলিয়ে গেল। তিনি বললেন, “বেড়াতে এসে তোমার মেয়ে শিঙারা না খেয়ে ছাড়বে?”
বিনি সামলাতে না পেরে ‘ইয়ে-য়ে’ বলে চিৎকার করে উঠল। বাবাও তার সঙ্গে তাল রেখে হাত মুঠো করে শূন্যে তুলে এমনভাবে ঝাঁকালেন যেন বুমরার বল স্টেডিয়ামের বাইরে পাঠিয়ে দিয়েছেন।
দোকানি তাদের খাতির করে দোকানের সামনে বেঞ্চে বসাল আর হাতে কাগজের প্লেট দিয়ে গেল। বিনি হাতে গরম লাগবে বলে ডবল প্লেট নিল। উনুনের পাশে ঝুড়িতে সদ্য ভাজা শিঙারা রাখা আছে। সে সবার প্লেটে দুটো করে দিয়ে গেল, সঙ্গে তেঁতুলের চাটনি। বিনি হাত ছুঁইয়ে দেখল ভীষণ গরম। তাই দেখে বাবা হাত দিয়ে একটা শিঙারা ভেঙে দু-টুকরো করে দিলেন, ভুসভুস করে ধোঁয়া আর সুগন্ধ বেরিয়ে এল। বিনি ফুঁ দিতে লাগল। বাবা ততক্ষণে নিজেরটায় কামড় দিয়েছেন। জিভের মধ্যে গরম সইয়ে নিয়ে স্বাদ নিতে নিতে বললেন, “ভালো খেতে। টাটকা।”
বিনিও খেতে শুরু করল। তারও বেশ লাগছে। টাটকা, ঝাল ঝাল। একটা স্থানীয় ভাব আছে।
মাও খাচ্ছেন। তিনি ওদের দিকে তাকিয়ে বললেন, “তোদের মৌচাকের শিঙাড়ার থেকেও ভালো?”
মৌচাক তাদের পাড়ার বিখ্যাত মিষ্টির দোকান। সকালে শিঙারা পাওয়া যায়। বাবা রবিবারে মাঝেমধ্যে নিয়ে আসেন। সাইজে ছোটো শিঙাড়ার প্রায় ডবল। ভিতরের পুরে কী মশলা দেয় ওরাই জানে, কামড় দিলে স্বাদে আর আমেজে বিনির চোখ বন্ধ হয়ে আসে। কিন্তু এখন মৌচাকের সঙ্গে তুলনা তার ভালো লাগল না। বিনির কাছে যে-কোনো ভালো খাবারই হল অমৃতের মতো। আর অমৃত কি কখনও খারাপ হতে পারে?
ফেরার পথে বিনি দেখল, বাঁদিকে বিচের লাগোয়া হোটেল আর রেসর্টগুলির আলো জ্বলে উঠেছে। সমুদ্র যেন প্রায় তাদের গায়ে আছড়ে পড়ছে। নীলচে জল, সাদা ঢেউ আর এই দীপমালা যেন মিলেমিশে একাকার। বিনির দৃশ্যটা অসাধারণ লাগল। সে বাবার মোবাইল চেয়ে নিয়ে একটা ছবি তুলল।
হোটেলে ফিরে বাবা কিন্ডল নিয়ে সোফায় হেলান দিলেন। মা টিভি চালিয়ে প্রিয় বাংলা সিরিয়াল দেখতে লাগলেন। বিনির কিছু করার নেই। সে মাকে বলল, “আমি একটু লবি থেকে ঘুরে আসব?”
মা টিভি থেকে চোখ না সরিয়েই বললেন, “না, একা যাবে না। বাবাকে নিয়ে যাও।”
কিন্তু বাবাও কিন্ডলে ডুবে আছেন। বিনি একটু ভাবল। দরজাটায় খালি সেফটি-চেন লাগানো আছে, লক করা নেই। সে নিশব্দে দরজা খুলে বেরিয়ে গেল। তাড়াতাড়ি ফিরে এলে বাবা-মা হয়তো টেরও পাবেন না।
লবিটা মোটামুটি ফাঁকা। রিসেপশনে হোটেলের ইউনিফর্ম পরে একটা দিদি বসে আছে, তাকে দেখে হাসল। সামনে সোফায় দুটো কাকু বসে গল্প করছে। বিনি যেখানে টিভি রাখা আছে, সেদিকে গেল। একটা জেঠু (বিনির মনে হল, ইনি বাবার থেকে বয়সে বড়ো, তাই জেঠু কথাটাই মনে এল) রিমোট দিয়ে চ্যানেল বদলে বদলে দেখছেন। তাকে দেখে রিমোট নামিয়ে রেখে হাসলেন, যেন তার জন্যই অপেক্ষা করছিলেন। ভরাট মিষ্টি গলায় বললেন, “কী নাম তোমার, ইয়াং লেডি?” তারপরে একটু সরে গিয়ে জায়গা করে দিয়ে হাসিমুখে বললেন, “তোমার আপত্তি না থাকলে এখানে বসতে পার।”
বিনির ভারি মজা লাগল। জেঠুটা এমন ভাব করছে যেন তাঁর কতকালের চেনা। সে পাশে গিয়ে বসল। তারপর সপ্রতিভভাবে হেসে বলল, “আমার নাম অপরাজিতা দাশগুপ্ত।”
জেঠু বললেন, “আর আমি হচ্ছি শৈবাল সান্যাল। দাঁড়াও, এই টিভিটাকে আগে জব্দ করি।”
জেঠু রিমোট তুলে টিভি অফ করে দিলেন। তারপর হেসে বললেন, “আমাদের সময়ে শুধু একটা চ্যানেল ছিল। সেটাই সবাই মিলে হইচই করে দেখতাম। এখন এত চ্যানেল হয়েছে, ঠিক করতে পারি না কোনটা দেখব। সেইজন্যই হয়তো কোনোটাতেই মন বসে না।”
জেঠু এবার বললেন, “কোন ক্লাস, কোন স্কুল, কোথায় থাকো এসব কিন্তু জানতে চাইব না। তুমি অপরাজিতা, আজ থেকে আমার বন্ধু, ব্যস। শুধু একটা কথা, তুমি বাবা-মাকে বলে এসেছ তো? না চুপিচুপি দরজা খুলে চলে এসেছ?”
বিনি হেসে বলল, “শেষেরটা।” জেঠুকে তার বেশ লাগছে।
জেঠু ভয় পাওয়ার ভান করে বললেন, “ওরে বাবা! এই বয়সে কিডন্যাপিংয়ের দায়ে জেলে যেতে পারব না। তুমি একটা কাজ করো। রিসেপশন থেকে ঘরে একটা ফোন করে বলে দাও, এখানে জেঠুর সঙ্গে গল্প করছ।”
বিনির পরামর্শটা মনে ধরল। তবে মা ধরলে রাজি হবে না, এই যা। সে রিসেপশনে গিয়ে দিদিটাকে রুম-নাম্বার বলল। ভাগ্যিস বাবাই ধরলেন। শুনে-টুনে বললেন, “ঠিক আছে, বেশি দেরি করিস না।”
সে ফিরে এল। জেঠু খুশি হয়ে বললেন, “এবারে নিশ্চিন্ত হয়ে বসো। আচ্ছা, একটা কথা, তুমি ক্লাসে ফার্স্ট-টার্স্ট হও না তো? তাহলে আমার সঙ্গে জমবে না। ফার্স্ট-সেকেন্ড হওয়া ছেলেমেয়েদের আমি ভীষণ ভয় পাই।”
বিনি হেসে ফেলল। তারপর মুখটা একটু গম্ভীর করে বলল, “আমি কিন্তু প্রথম দশজনের মধ্যেই থাকি।”
জেঠু মুচকি হেসে বললেন, “চলবে। আমিও কী করে একবার ঢুকে গেছিলাম। তবে তুমি যদি বাবা-মাকে না বলে দাও, চুপিচুপি একটা কথা বলি। আইনস্টাইন, এডিসন বা হালফিলের স্টিভ জোবস—এঁরা কেউই কিন্তু স্কুলে ভালো রেজাল্ট করেননি।”
এটা বিনি জানত না। শুনে তার মজা লাগল।
তারপর জোরদার আড্ডা শুরু হল। কলকাতা, স্কুল, বেড়ানো, কোহলি, পি.ভি সিন্ধু—সবকিছু। বিনি এমনিতে খুব বকবকি নয়, কিন্তু আজ যেন তাকে কথায় পেয়েছে। জেঠুও খুব আগ্রহভরে প্রতিটি কথা শুনছেন, মাঝেমধ্যে দু-একটা মন্তব্য করছেন। যেমন সে টিটি খেলে শুনে বললেন, “তোমাদের বাড়ির কাছে একটা ভালো কোচিং সেন্টার আছে। বাবাকে বোলো সেখানে কথা বলে দেখতে।” সে আর্চির কমিকস পড়তে ভালোবাসে শুনে বললেন, “আমি এই বয়সেও পড়ি।” তারপর একটা দুষ্টু হাসি দিয়ে বললেন, “তোমাকে বাংলা বইও একটু আধটু পড়তে হয় বোধ হয়?”
এটা সত্যিই বিনির দুঃখের জায়গা। তার অভ্যাস নেই বলে বাংলা বই তাকে ধরে ধরে পড়তে হয়, ধৈর্য থাকে না। বাবা তাকে কখনও জোর করেন না। কিন্তু বাবার খারাপ লাগবে ভেবে সে ভালো না লাগলেও পড়ে।
সে সত্যি কথাই বলল। জেঠু যেন একটু চিন্তিতভাবে বললেন, “আচ্ছা, তুমি তো চমৎকার বাংলা বলো। আর আজকাল তো চিঠি লেখার চল উঠেই গেছে। তা হলে তোমার বাবা-মা তোমাকে বাংলা পড়াতে চান কেন?”
বিনি প্রথমে বলল, “কী জানি।” তারপর হঠাৎ একটা কথা তার মনে পড়ল। সে বলল, “বাবা বলেন, বাংলায় ছোটোদের জন্য লেখা ভালো ভালো বই আছে—শঙ্কু, কাকাবাবু…”
জেঠু ঘাড় নেড়ে বললেন, “সে তো সব ভাষাতেই আছে। বাংলাতেই কেন?”
বিনি আবার একটু ভেবে বলল, “আসলে বাবা-মা ওই বইগুলো পড়েছেন, ভালো লেগেছে। তাই হয়তো চান…”
জেঠু বললেন, “তা হতে পারে। এখন তুমি চাইলে দু-একটা পড়ে দেখতে পার। যদি ভালো না লাগে, ওঁদের বলে দিও।”
বিনি অবাক হয়ে দেখল, এখন আর ব্যাপারটা অত খারাপ কিছু মনে হচ্ছে না। সে খুশি হয়ে বলল, “তাই করব, জেঠু।”
আরও টুকটাক কথা হল। বিনির খেয়াল হল, জেঠুর ব্যাপারে কিছু জানাই হয়নি। সে জিজ্ঞেস করল। জেঠু হেসে বললেন, “আমি যাদবপুরে একটা ছোটো ফ্ল্যাটে একাই থাকি। কাজ সেরকম কিছু করি না, মাঝেমধ্যে অল্প-স্বল্প লেখালিখি।”
বিনি আর কিছু বলার আগেই জেঠু অন্য প্রসঙ্গে চলে গেছেন। বললেন, “তোমার বেড়ানোর গল্প শোনা যাক। গত বছর দিল্লি গেছিলে বললে না? খুব সুন্দর শহর। কোন জায়গাটা সবথেকে ভালো লাগল?”
বিনির মুখ ফসকে বেরিয়ে গেল—“চাঁদনির পরাঠাওয়ালা গলি।” বলেই সে আধহাত লম্বা জিভ কাটল। কিন্তু আর কিছু করার নেই। জেঠুকে দেখে মনে হল কষ্ট করে হাসি চেপে আছেন। সে অবস্থা সামাল দিতে স্মার্ট হবার চেষ্টা করে বলল, “আসলে কোথাও গেলে সেখানকার খাবারদাবারগুলো না টেস্ট করলে ঠিক…”
জেঠু বললেন, “সে তো বটেই, আমিও তাই করি। আসলে বাঙালি মাত্রেই বোধ হয় খাদ্যরসিক। তো খাবারের সেরা শহর তো আমাদের কলকাতা। তোমার ফেভারিট খাবারের আইটেমগুলি কী কী?”
বিনি আর রাখ-ঢাক না রেখে গড়গড় করে বলতে লাগল, “নকুড়ের সন্দেশ, মিত্র কাফের কাটলেট, অনাদির মোগলাই, কুকিজারের কেক, ট্যাংরার চাইনিজ, রয়্যালের চাঁপ আর বিরিয়ানি, দিলখুশার কবিরাজি…”
জেঠু তাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, “ব্যস ব্যস, আর বোলো না, জিভে জল এসে যাচ্ছে। আর এসব তো বিখ্যাত দোকান। এ ছাড়াও শহরের আনাচে-কানাচে কত মণিমুক্তা আছে—লোহাপট্টির মোড়ে একটা ছোটো দোকানে সকালে ছোটো ছোটো হিঙের কচুরি ভাজে, খোসাসুদ্ধ আলুর তরকারি দিয়ে দেয়—আহা-হা।”
জেঠু আবেশে চোখ বন্ধ করে ফেললেন। বিনির ভারি মজা লাগল।
তারপরে জেঠু-ভাইঝির মধ্যে খানিকক্ষণ বিভিন্ন পদের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম স্বাদ নিয়ে জটিল আলোচনা চলল।
তারপর জেঠু বললেন, “আচ্ছা, আমরা যে খেতে এত ভালোবাসি, তার কারণ কি কখনও ভেবেছ?”
বিনি অবাক হয়ে বলল, “মানে?”
জেঠু বললেন, “ধরো কোনও খাবারে তুমি স্বাদ পাচ্ছ না। অথচ হাতের কাছে অন্য কিছু নেই। তুমি কী করবে?”
বিনি একটু ভেবে বলল, “কম করে খাব।”
জেঠু হেসে বললেন, “ঠিক বলেছ। অর্থাৎ, খাবারে স্বাদ না পেলে আমাদের খাওয়ার আগ্রহ চলে যায়। অথচ না খেলে শরীর টিকবে না। এজন্যই প্রকৃতি আমাদের জিভে স্বাদ দিয়েছেন। এজন্য লজ্জা পাবার কিছু নেই।”
বিনি অবাক হয়ে গেল। এভাবে সে কখনও ভাবেনি। তার হঠাৎ মনে হল, জেঠু গল্প করতে করতে তাকে অনেক কিছু শিখিয়ে দিচ্ছেন। আর তার মোটেই খারাপ লাগছে না।
জেঠু এবার বললেন, “অথচ দুঃখের কথা কী জানো, পৃথিবীর অর্ধেক মানুষ কখনও ভালো খাবারের স্বাদ পায় না। তারা বেঁচে থাকার জন্য যা পায় তাই খায়। সে বড়ো কষ্টের খাওয়া। কিংবা তাদের হয়তো অভ্যেস হয়ে যায়। আমরা বুঝবও না।”
জেঠু চুপ করে গেলেন। বিনিও চুপ করে রইল। জেঠুর এই কথাটা সেও বুঝতে পারছে। বাবাও মাঝেমধ্যে বলেন।
রিসেপশনের ফোন বাজল। জেঠু ঘড়ি দেখে চমকে উঠে বললেন, “আধঘণ্টার জায়গায় একঘণ্টা হয়ে গেল। নিশ্চয়ই তোমার খোঁজ করছেন। আমি খেয়ে নিয়েছি, কাল ব্রেকফাস্টে দেখা হবে। টা টা।”
বিনি ঘরে ঢুকে দেখল পরিস্থিতি থমথমে। মনে হল সে এত দেরি করায় বেচারি বাবা বকুনি খেয়েছেন। সেও কাঁচুমাচু মুখে বসে রইল। সেটা দেখেই বোধ হয় মাও আর বেশি কিছু বললেন না।
একটু পরে বাবা বললেন, “চল, খেয়ে আসা যাক।”
খেতে খেতে বিনি জেঠুর কথা বলল। বাবা শুনে-টুনে বললেন, “লেখালেখি করেন? নাম জিজ্ঞেস করেছিলি?”
বিনি বলল, “হ্যাঁ। শৈবাল সান্যাল।”
বাবা আর মা দুজনেই চমকে উঠলেন। বাবা উত্তেজিত হয়ে বললেন, “তুই ওঁর সঙ্গে এতক্ষণ আড্ডা দিয়ে এলি? উনি তো বিখ্যাত লেখক! গল্প-উপন্যাস ছাড়া অন্য বিষয় নিয়েও চমৎকার লেখেন। অনেক পুরস্কারও পেয়েছেন।”
বলাই বাহুল্য, বিনির খুব আনন্দ হল। মা বললেন, “আমাদের সঙ্গে আলাপ করাবি না?”
বিনি বলল, “জেঠু বলেছেন কাল সকালে ব্রেকফাস্টে দেখা হবে।”
পরের দিন আটটা নাগাদ খাওয়ার ঘরে ঢুকে তারা দেখল জেঠু চারজনের একটা টেবিলে একা বসে আছেন। তাদের দেখে হেসে হাত তুললেল। বাবা আর মা দুজনেই কাছে গিয়ে হাতজোড় করে নমস্কার করলেন। জেঠু প্রতি-নমষ্কার করে ওঁদের বসার জায়গা করে দিলেন। বিনি জেঠুর পাশে গিয়ে বসল। বাবা-মা উলটোদিকে। বাবা কথা শুরু করে বললেন, “কাল বিনির কাছে আপনার নাম শুনে অবাক হয়ে গেছি। আমরা দুজনেই আপনার লেখার খুব ভক্ত।”
জেঠু হেসে বললেন, “আমিও আপনাদের মেয়ের খুব ফ্যান হয়ে গেছি।” তারপর বললেন, “চলুন, খেতে খেতে গল্প করা যাক।”
ওঁরা চারজনেই উঠে বুফে থেকে যে-যার পছন্দমতো খাবার নিয়ে এলেন। বিনি নিল পুরি-সবজি।
খেতে খেতে গল্প হতে লাগল। একসময় জেঠু বললেন, “আপনাদের কাছে একটা অনুমতি চাইব। আপনারা তো শুনলাম বিশ্রাম করতেই এসেছেন, বিনিকে নিয়ে কি আমি কয়েক ঘণ্টার জন্য কাছে একটা জায়গায় যেতে পারি?”
মা আর বাবা মুখ চাওয়াচাওয়ি করলেন। মা বললেন, “কোথায়… মানে…”
জেঠু বললেন, “তা হলে খুলেই বলি। এখান থেকে ঘণ্টা খানেক দূরে একটা গ্রামে আমি বাচ্চাদের জন্য একটা বোর্ডিং-কাম-স্কুল চালাই। যখনই আসি, ওদের সঙ্গে দেখা করে যাই। ওরা অবশ্য না খাইয়ে ছাড়ে না। তাই ভাবছিলাম, বিনিকে নিয়ে গেলে ওর হয়তো ভালো লাগবে।”
বাবা খুশি হয়ে বললেন, “এ তো খুব ভালো কথা। বিনি অতি অবশ্যই যাবে। তবে যদি আপনার আপত্তি না থাকে তা হলে কি আমরাও যোগ দিতে পারি?”
জেঠু ব্যস্ত হয়ে বললেন, “অতি অবশ্যই। আসলে আপনারা বেড়াতে এসেছেন, তাই আমি আর আপনাদের বলিনি। এলে খুব ভালো লাগবে।”
এগারোটা নাগাদ জেঠুর গাড়িতে করে তারা বেরোল। জেঠুর ড্রাইভার আছে।
আধঘণ্টা পরে পিচের রাস্তা ছেড়ে তারা কাঁচা রাস্তায় ঢুকল। গাড়ি লাফাতে লাফাতে চলেছে। একটু পরে গ্রামের মধ্যে ঢুকল। বিনি এর আগে সিনেমায় ছাড়া কোনও গ্রাম দেখেনি। সে দেখল বাড়িগুলি পাকাই, তবে দু-একটি বাদে সব বাড়িরই ছাদে লাল টাইলস। দু-একটি টিনের চালও আছে। একটা পুকুরও চোখে পড়ল, ফাঁকে ফাঁকে গাছগাছালি। একটা স্কুলও দেখল—পাকা বাড়ি, সামনে সাইনবোর্ডে গ্রামের নাম আর ‘প্রাথমিক বিদ্যালয়’ লেখা আছে। জেঠু বললেন, এখানে ক্লাস এইট অবধি পড়ানো হয়। এখন বোধ হয় সবে ছুটি হয়েছে, কিছু ছেলেমেয়ে স্কুল থেকে বেরোচ্ছে।
আরও এগোতে আর একটা পাকা সাদা রঙের বাড়ি চোখে পড়ল। জেঠু বললেন, “এটা গ্রামের স্বাস্থ্যকেন্দ্র।”
একটা মোবাইল টাওয়ারও দেখা গেল।
একটু পরে গাড়িটা একটা দোতলা বাড়ির সামনে এসে থামল। এটাই বোধ হয় জেঠুর স্কুল। সকলে গাড়ি থেকে নামলেন।
বাড়িটা সদ্য চুনকাম করানো হয়েছে। জানালা-দরজা কচি কলাপাতা রঙ দিয়ে পেইন্ট করা হয়েছে। গেটের মুখে দু-দিকে দুটো বড়ো ঝাঁকড়া গাছ, হলুদ ফুলে ভরে আছে। বিনি নাম জানে না। সব মিলিয়ে দেখতে ভালোই লাগছে।
গাড়ির আওয়াজ পেয়ে এক মাঝবয়সি ভদ্রলোক বেরিয়ে এসেছেন। হাসিখুশি অমায়িক চেহারা। জেঠুর সঙ্গে বোধ হয় আগেই কথা হয়েছে। বাবা-মাকে নমস্কার করে বললেন, “আসুন, ভিতরে আসুন।”
জেঠু আলাপ করিয়ে দিলেন—“অমিয়বাবু। এই স্কুলে মোট তিনজন টিচার আছেন, ইনিই প্রধান। পড়ানো ছাড়াও স্কুলের অন্যসব কাজও দেখাশুনো করেন। বাকি দুজন ক্লাসে আছেন।”
ওঁরা ভিতরে ঢুকলেন। দু-ধাপ উঠে একটা ছোটো বারান্দা মতন, তার উলটোদিকে একটা ফাঁকা বড়ো ঘর। মাঝখানে একটা কাঠের টেবিল রাখা আছে। আর কোনও আসবাব নেই। অমিয়বাবু বললেন, “এটা খাওয়ার ঘর।”
পরের ঘরটিতে একটা দিদি ক্লাস নিচ্ছে। শ্যামলা, ছোটোখাটো, মুখটি ভারি মিষ্টি। ওদের দেখে পড়ানো থামিয়ে হাসিমুখে এগিয়ে এল। জেঠু বললেন, “কী রে, সব ভালো তো?”
দিদিটা হাসিমুখে ঘাড় নাড়ল। তারপর হঠাৎ সামনে ঝুঁকে বাবাকে প্রণাম করতে গেল। বাবা চমকে গেলেন, তবে শেষ মুহূর্তে কোনোরকমে হাত ধরে ফেললেন। মাও ঘাবড়ে গিয়ে দু-পা পিছিয়ে গেলেন। সবাই হেসে উঠল।
জেঠু বললেন, “এ হচ্ছে আমাদের তিন্নি। গ্রামেরই মেয়ে। জেলা-শহর থেকে বি.এসসি পাস করেছে। ভারি ভালো পড়ায়। আমিও মাঝেমধ্যে ওর ক্লাসে ঢুকে বসে থাকি।”
বাবা বললেন, “তিন্নি, আমাদের একটু বসতে চান্স দেবে না?”
তিন্নি হেসে বলল, “বাপ রে, আপনাদের মতো সব পণ্ডিত মানুষ ক্লাসে থাকলে আমার সব গোলমাল হয়ে যাবে।”
আরও দু-চারটে কথার পর তিন্নি ক্লাসে চলে গেল।
এবারে ওরা সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠলেন। এখানে ডানদিকে প্রথম ঘরটাতেও ক্লাস হচ্ছে। চশমা পরা একটু গম্ভীর দেখতে একটা কাকু পড়াচ্ছেন, এঁরও বয়স খুব বেশি নয়। ওদের দেখে পড়ানো থামিয়ে তাকালেন। জেঠু বললেন, “বিনয়, এঁরা কলকাতা থেকে এসেছেন। ক্লাস শেষ করে এসো, তখন আলাপ করিয়ে দেব।”
কাকু ঘাড় নাড়লেন।
পাশের ঘরে একটা ওভাল শেপের টেবিল ঘিরে কয়েকটা চেয়ার। বিনির মনে হল, টিচার্স রুম। সবাই বসলেন। অমিয়কাকু বাবাকে বললেন, “একটু চা খাওয়া যাক দাদা?”
বাবা বললেন, “তা মন্দ হয় না। কিন্তু এখানে কি ধারেকাছে দোকান আছে?”
অমিয়বাবু হেসে বললেন, “দোকানের থেকে ভালোই হবে।”
বিনি চারদিকে তাকিয়ে খেয়াল করল, একপাশের দেয়ালে একটা ছোটো সিমেন্টের তাক, আর সেখানে একটা হিটার আর চায়ের সরঞ্জাম রাখা আছে। একপাশে একটা বড়ো পাত্রে জলও রাখা আছে। অমিয়বাবু উঠে গিয়ে চায়ের জল বসালেন।
টুকটাক কথা হতে লাগল। জেঠু বললেন, “আপাতত ক্লাস টেন অবধিই আছে। যারা সরকারি স্কুল থেকে ক্লাস এইট অবধি পড়েছে, তারপর সামর্থ্য না থাকায় বড়ো স্কুলে যেতে পারে না, তাদের জন্য। অনেকে আবার দুপুরের খাওয়াটুকুর জন্যও আসে। সরকারি সাহায্যের জন্য আবেদন করেছি, পাব কি না জানি না। আপাতত নিজেই চালাই।”
চা এল। সঙ্গে বিস্কুট। মা চায়ে চুমুক দিয়ে বললেন, “বেশ বানিয়েছেন।”
অমিয়কাকু হেসে বললেন, “এখানে জুতো সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ সব আমাদেরই করতে হয়।” তারপর ঘড়ি দেখে বললেন, “চা-টা খেয়ে যাওয়া যাক। এদের খাওয়ার সময় হয়ে এল।” তারপর সামান্য হেসে বললেন, “আসলে এদের কারও বাড়িতে জলখাবারের চল নেই। সকালে উঠে বড়োজোর জলে ভিজিয়ে মুড়ি-টুড়ি খেয়ে চলে আসে। তাই দুপুরের খাবারের জন্য আর তর সয় না।”
বিনিও মাঝেমধ্যে মুড়ি খায়, তবে তেল দিয়ে মেখে চানাচুর-টুর দিয়ে। তার মনে হল, জল দিয়ে মুড়ি খেতে কেমন লাগে কে জানে।
নীচে নেমে দেখা গেল সেই টেবিলটার উপর একটা বিশাল ডেকচি রাখা আছে। পাশে ছোটো আর একটা। তার পাশে এক স্তূপ শালপাতার প্লেট। সামনে একটা মাসি দাঁড়িয়ে আছে। জেঠু বললেন, “এ হল গীতা। রান্না থেকে শুরু করে বাসন মাজা, ঝাড়ু দেওয়া সব ও করে। ওকে ছাড়া স্কুল অচল।”
মাসি লাজুকভাবে হাসল। তারপর বলল, “আপনাদের খেতে দিই? গরম গরম ভালো লাগবে।”
বাবা বললেন, “না। আগে ছেলেমেয়েরা খেয়ে নিক।”
জেঠু বললেন, “তা হলে একটু বসা যাক।”
মাসি কোথা থেকে একটা মাদুর নিয়ে এসে একপাশে বিছিয়ে দিল। ওঁরা বসলেন।
একটু পরেই হইহই করে ছেলেমেয়েরা এসে গেল আর এক এক করে লাইনে দাঁড়িয়ে পড়ল। জেঠু উঠে গিয়ে ঘুরে ঘুরে সবার খবর নিতে লাগলেন। বিনি দেখল, দাদা-দিদিরা ওদের দিকে ঘুরে ফিরে দেখছে। বোধ হয় তাদের মতো শহুরে লোক এখানে বেশি আসে না।
ওরা খাওয়া শুরু করল। খিচুড়ি আর লাবড়ার তরকারি। সবাই মহানন্দে খাচ্ছে আর গল্প করছে। বিনির মনে হল, ওদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে একসঙ্গে খেতে পারলে বেশ হত।
একটু পরে একটি মেয়ে আর একটি ছেলে এসে জেঠুকে কী বলল। জেঠু বিনিকে বললেন, “ওরা জিজ্ঞেস করছে তুমি কি ওদের সঙ্গে খাবে?”
বিনি বাবার মুখের দিকে তাকাল। বাবা বললেন, “খেয়ে নে। আমরা না-হয় পরে খাব।”
বিনি ওদের সঙ্গে গিয়ে মাসির কাছ থেকে শালপাতার প্লেটে খিচুড়ি আর তরকারি নিল। তারপর তিনজনে একপাশে সরে গিয়ে খাওয়া শুরু করল। বিনি এর আগে ভোগের খিচুড়ি খেয়েছে, কিন্তু এটা ঠিক সেরকম নয়। হয়তো তেল-মশলা কম পড়েছে। তবে তরকারিটা বেশ অন্যরকম।
খেতে খেতে গল্প জমে উঠল। ছেলেটির নাম শঙ্কর আর মেয়েটির নাম রূপা। দুজনের বাবারই অল্প কিছু জমি আছে, তার থেকে যা আয় হয় তাতে কুলোয় না বলে টুকটাক অন্য কাজও করেন। মেয়েটি বলল, “আমার আর পড়াশুনো হত না। ভাগ্যিস, জেঠু এই স্কুলটা করলেন।”
দেখতে দেখতে আরও কয়েকজন যোগ দিল। এদের কেউ কেউ কলকাতায় গেছে। বিনি কোথায় থাকে, কোন স্কুলে পড়ে সব জানতে চাইল। বিনিও গ্রামের গল্প শুনল। বেশ কয়েক বছর আগে বিদ্যুৎ এসেছে, তবে মাঝেমধ্যে চলে যায় বা টিমটিম করে জ্বলে। তাও আগের থেকে অনেক ভালো। মোবাইল টাওয়ারও আছে। এমনি মোটামুটি ভালোই চলে, তবে বিদ্যুৎ না থাকলে বন্ধ হয়ে যায়। এদের কারোরই মোবাইল নেই, তবে কয়েকজনের বাড়িতে আছে।
বিনি জিজ্ঞেস করল, “সন্ধ্যাবেলা তোমরা কী করো?”
একটি ছেলে বলল, “আলো থাকলে তো মজা। না থাকলে লন্ঠন জ্বালিয়ে পড়ি। তবে মশাগুলো জ্বালায়। চটাস চটাস করে মারি আর পড়ি।”
সে নিজের গায়ে থাপ্পড় মেরে দেখাল। সবাই হেসে উঠল।
শঙ্কর বলল, “ওইজন্য আমরা রাতে তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়ি আর খুব সকালে উঠি।”
ওদের খাওয়া শেষ হয়ে এল। বিনি তাকিয়ে দেখল, বাবা, মা, জেঠু আর অমিয়কাকুও একজায়গায় দাঁড়িয়ে খাওয়া শুরু করেছেন।
একটি ছেলে বিনিকে বলল, “আর একটু নেবে?”
বিনি হেসে ঘাড় নেড়ে বলল, “না। পেট ভরে গেছে।”
তারা যে-যার এঁটো পাতা বারান্দায় একটা ড্রামে ফেলে এল। পাশে একটা বালতি থেকে মগে করে জল নিয়ে হাত-মুখ ধুয়ে নিল। রূপাকে জিজ্ঞেস করতে বলল, “এখানে কলের জল এখনও আসেনি, টিউবওয়েলই ভরসা। শুনেছি জলের লাইনের কাজ শুরু হয়েছে। কতদিন লাগবে জানি না।”
এবার বিদায় নেবার পালা। বিনি হাসিমুখে সকলের দিকে তাকিয়ে বলল, “চলি। তোমরা কলকাতায় এলে আমাদের বাড়ি আসবে কিন্তু, খুব ভালো লাগবে।”
শঙ্কর হেসে বলল, “হ্যাঁ, জেঠু বলেছেন, একদিন আমাদের কলকাতা দেখাতে নিয়ে যাবেন। তখন যাব।”
রূপা এগিয়ে এসে তার হাত জড়িয়ে ধরে হাসিমুখে বলল, “আবার এসো ভাই, তোমাকে আমাদের খুব ভালো লেগেছে।”
বিনি বলল, “হ্যাঁ, আসব।”
তারপর হঠাৎ সে প্রায় ছুটে জেঠুদের কাছে গিয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। জেঠু তাকে কাছে টেনে নিয়ে বললেন, “গল্প হল? খিচুড়ি আর লাবড়া কেমন খেলি?”
বিনি মুখে হাসি টানল। তারপর বলল, “খুব ভালো জেঠু, এত ভালো খিচুড়ি আমি আগে খাইনি।”
জেঠু তার দিকে তাকিয়ে হাসলেন। সে বাবা-মায়ের দিকে তাকিয়ে দেখল, তাঁদের মুখেও একটুকরো হাসি ফুটে উঠে জলের দাগের মতো মিলিয়ে যাচ্ছে।
জয়ঢাকের গল্পঘর
লেখকের কুড়িটি কিশোর কাহিনির সঙ্কলন ‘ভয়ের ভাক্সিন” সম্বন্ধে জানতে ও জয়ঢাক প্রকাশনের বুকস্টোর থেকে অর্ডার দিতে নীচের ছবিতে ক্লিক করুন
