গল্প-ব্যথা যখন-বিশ্বদীপ সেনশর্মা-বর্ষা ২০২৪

এইলেখকের আগের গল্প কৃপণের বামমুঠি, দহনভার, পরবাস, সাভান্ত, ছিন্নমূল, স্বপ্নসম্ভব 

golpobyatha

সকালে হাঁটতে বেরিয়ে সোমকের কেমন  একটা অস্বস্তি হচ্ছিল।  সবই ঠিকঠাক, সকালের নরম আলো আর সবুজ গন্ধে পার্ক ভরে আছে, রোজকার মতই আশপাশ দিয়ে লোকজন হেঁটে বা দৌড়ে যাচ্ছে, তবু ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় কিছু একটা জানান দিচ্ছে।

কেউ কি তাঁকে ফলো করছে? সব দুঁদে পুলিশ অফিসারের মত কর্মজীবনে তাঁরও কিছু শত্রু  তো ছিলই; কিন্তু এতদিন পরে কেউ এসে হামলা করবে বলে মনে হয় না৷ তবু সাবধানের মার নেই। একটু পরে  রাস্তাটা বাঁদিকে ঘুরে গেছে৷ দেখা গেল সোমক কোথাও নেই।  একটি লোক  রাস্তার বাঁকে দাঁড়িয়ে বিভ্রান্তভাবে ইতি-উতি তাকাচ্ছে।   এইসময় কেউ  পিছন থেকে তার পিঠে টোকা দিল।  সে চমকে উঠে ঘুরে দাঁড়িয়ে  দেখল সোমক হাসি মুখে দাঁড়িয়ে আছেন।
সে প্রথমে ঘাবড়ে গেল তারপর দাঁত বার করে  হেসে ফেলে বলল, স্যার, আপনি এখনও আগের মতই আছেন। সোমক  হাসি মুছে ফেলে রাগত ভাবে বললেন, “ঝেড়ে কাশো বাবলু, সকাল সকাল আমার পেছনে লেগেছ কেন?”
লোকটি  করুণ ভাবে বলল, “স্যার আপনার বাড়িতে তিনবার  গেছি।  সিকিওরিটি কিছুতেই ঢুকতে দেয় না।   পুলিশের লোক বললেও পাত্তা দেয়নি।  আর আপনি তো ফোনই তোলেন না।”

সোমক বিরক্তভাবে বললেন, “একজন মানুষের কি নিজের মত থাকার অধিকার নেই? একজন রিটায়ার্ড অফিসারের সঙ্গে তোমাদের এত দরকারই বা কিসের?” 

বাবলু হাতজোড় করে বলল, “স্যার একটু  সময় দিন।”

পাশে একটা বেঞ্চ খালি আছে।  সোমক সেদিকে তাকিয়ে দুহাতের দশটা আঙুল তুলে বললেন, “দশ মিনিট।”

তাঁরা গিয়ে বসলেন। বাবলু চটপট কথা শুরু করে বলল, স্যার আপনি নিশ্চয়ই জানেন বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞানী অহিভূষণ  সেনগুপ্ত কদিন আগে নিরুদ্দেশ হয়েছেন। ইনি আপনার বন্ধুও।”

সোমক পড়েছেন।  তিনি বিরক্তভাবে  বললেন,  “অহি’কে কি আমার বাড়িতে লুকিয়ে রেখেছি মনে হয়?”

বাবলু জিভ কেটে বলল, “না স্যার।  ওনার খোঁজ আমরা পেয়েছি।  উনি বারুইপুরে একটা বিশাল বাগানবাড়িতে আছেন।  চারিদিকে প্রাইভেট সিকিওরিটি’র  কড়া পাহারা,  একটা মাছিও ঢুকতে পারবে না।”

সোমক একটু অবাক হয়ে বললেন,  “ওকে কি কিডন্যাপ করা হয়েছে?  না হলে সমস্যাটা কোথায়?  ও বিজ্ঞানী মানুষ, হয়তো কিছুদিন শান্তিতে কাজ করার জন্য ওখানে গেছে।”

বাবলু ঘাড় চুলকে বলল, “তা হলে ব্যাপারটা আপনাকে বলি।  উনি  ভিড়ভাড় এড়িয়ে শান্তিতে নিজের কাজ করতে ভালবাসেন।  কিন্তু সমস্যা হল, উনি আইন-কানুন, রীতি-নীতি  এসবের বিশেষ পরোয়া করেন না। মাঝেমধ্যেই অদ্ভূত সব মন্তব্য করে সরকারকে অস্বস্তিতে ফেলে দেন। অত বড়ো মানুষের কথা লোকে ও শুনবেই!”
বাবলু  একটু থামল।  সোমক গম্ভীরভাবে   শুনছেন।   বাবলু বলল, “তা ছাড়া,  ওনার আর একটা স্বভাব হল বিচিত্র ও বিপজ্জনক সব গবেষণায় জড়িয়ে পড়া। আপনার হয়তো মনে আছে কয়েক বছর আগে উনি একটা বিতর্কে জড়িয়েছিলেন।”

ভালই মনে আছে সোমকের। তাঁর এই বন্ধুটি তখন সস্তায় ছোটো নিউক্লিয়ার জেনারেটর কিভাবে বানান যায় তা নিয়ে একটা পেপার লিখে বিজ্ঞানী মহলে হইচই ফেলে দিয়েছিলেন। কিছুদিন পরে আমেরিকার একটি বিখ্যাত প্রতিষ্ঠান তা নিয়ে হাতেকলমে কাজ করতে শুরু করে এবং অহিভূষণ মহা উৎসাহে কলকাতা থেকে তাদের যাবতীয় পরামর্শ দিতে থাকেন।  ব্যাপারটা জানাজানি হয়ে যায়।  আন্তর্জাতিক মহলের  এবং দেশের আভ্যন্তরীণ চাপে পড়ে আমেরিকার সরকার কোম্পানিটিকে গবেষণা থামিয়ে আগে এই মেশিনের সেফটি প্ল্যান জমা দিতে নির্দেশ দেয়। তারা  দিয়েওছিল, সরকার সন্তষ্ট হননি, নতুন কমিটি গড়া হয়। এইসব করে ব্যাপারটা কিছুদিন পরে গেঁজিয়ে যায়। তবে সেই সময়.অহিভূষণকে সামলাতে সরকারের কালঘাম ছুটে গিয়েছিল। উনি এখনও বিশ্বাস করেন বিজ্ঞানের কাজে এইভাবে বাধা দেবার অধিকার সরকারের নেই। এখন ওঁর নিরাপত্তার নাম করে সরকার একটু দূর থেকে ওঁর গতিবিধির উপর কড়া  নজর রাখে। উনি অবশ্য তাদের পাত্তা দেন না, নিজের মত করে কাজ করে যান।

সোমক গম্ভীর মুখে বললেন, “এখন সমস্যাটা কি?”

বাবলু বলল, “স্যার আমরা অতি কষ্টে সামান্য যেটুকু খবর যোগাড় করেছি  উনি আবার কোন  বড়ো গবেষণায় হাত দিয়েছেন এবং এবারেও বিদেশী কোন সংস্থা এর সঙ্গে যুক্ত।  এবারে একটি অল্পবয়সী  মেয়ে,  এ নিজেও  বিজ্ঞানের ছাত্রী, ওনাকে সহায়তা করছে। আমাদের ধারণা গবেষণা শেষ পর্যায়ে, নয়ত উনি বাড়ি ছাড়তেন না।
এখন আমাদের উপর উপরমহল থেকে নির্দেশ এসেছে যেকরে হোক ওনার গবেষণার ব্যাপারে বিশদ তথ্য যোগাড় করতে।”

সোমকের একটু একটু করে আগ্রহ জাগছে।  তিনি বললেন, “অহি’র  প্রাইভেট সিকিওরিটি এজেন্সির কাউকে  অ্যাপ্রোচ করে দেখেছ?”

বাবলু হতাশভাবে বলল, “স্যার,  সবরকম চেষ্টা করা হয়েছে।  এমনকি কমিশনার নিজে এজেন্সির মালিকের সঙ্গে কথা বলেছেন, তাতেও কাজ হয়নি। বরং উনি স্পষ্ট বলেছেন, অহিভূষণের নির্দেশ আছে সরকার থেকে জোর করে কিছু করার চেষ্টা হলে সঙ্গেসঙ্গে কোর্টে গিয়ে স্টে অর্ডার নিতে।”

সোমক মনে মনে বললেন, ব্যাটা এবারে আঁটঘাট বেঁধে নেমেছে। ব্যাপারটা দেখা উচিত। তিনি মুখে বিরক্তির ভাব দেখিয়ে বললেন, “বুঝেছি।  ঠিকানাটা দিয়ে যাও, দেখি কিছু করা যায় কিনা।”

দুই

“স্যার রুদ্র বলছি।”

ওদিক থেকে বিদেশী অ্যাকসেন্টে গম্ভীর একটা গলা বলল,  “টেল মি রুদ্র। এনিথিং রং?”

সে বলল, “বস, ইন্ডিয়ান গভর্নমেন্ট ইজ ট্রাইং হার্ড। দে হ্যাভ রোপড ইন আ রিটায়ার্ড পুলিশ অফিসার।  হি ইজ আ কেপেবল গাই। অলসো হ্যাপেনস টু বি আ ক্লোজ ফ্রেন্ড অফ ড: অহিভূষণ।”

ওদিক থেকে কয়েক মুহূর্ত সাড়া নেই। তারপর গলাটা হতাশভাবে বলল, “এই ভয়টাই করছিলাম।  সরকারকে সামলান যায়, মানুষকে নয়। যাই হোক, নজর   রাখা ছাড়া আমাদের কিছু করার নেই। তাছাড়া ওঁর সিকিওরিটি’র ব্যবস্থা উনি নিজেই করেন। তুমি সিকিওরিটি এজেন্সির হেড’কে ব্যাপারটা জানিয়ে দাও আর আজকের রাতটা বিশেষভাবে সতর্ক থাকতে বলো।  দ্যাটস ইট।”

লাইনটা কেটে গেল।

তিন

বাবলু একটা ভিডিও পাঠিয়েছে।  সোমক সেটা খুঁটিয়ে দেখলেন।  বাড়িটার গেট থেকে শুরু করে সদরদরজা অবধি  দুই স্তরে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা।   তিনদিকে পাঁচিল এবং সামনের গেট সম্ভবত অদৃশ্য ইনফ্রারেড দিয়ে মোড়া আছে,  বিম স্পর্শ করলেই  চ্যাঁ করে অ্যালার্ম বাজবে।  এছাড়াও গোপন ক্যামেরা এবং মনিটরিং নিশ্চয়ই থাকবে। সরাসরি গিয়ে দেখা করার চান্স নেই। একমাত্র উপায় অহিভূষণের সঙ্গে আগে  কথা বলে নেওয়া। তিনি কল করে দেখলেন আনরিচেবল আসছে। হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ এবং শেষ চেষ্টা হিসেবে একটা মেল’ও পাঠালেন।
কোনটাই ডেলিভারি হল না। তাঁর মনে হল অহিভূষণ নিশ্চয়ই ফোন বা কম্পিউটার বন্ধ করে রাখেননি, শুধু বাইরে থেকে কল বা মেসেজ আসাই বন্ধ করে দিয়েছেন। মোবাইল কোম্পানিগুলি সরকারের কথায় কারও ফোন ট্যাপ করতে পারে কিন্তু  গ্রাহকের সেটিং-এ কখনই হাত দেবে না।

একটাই উপায় আছে।  তিনি মোবাইল থেকে একটা নম্বর ডায়াল করলেন।  একমিনিট কথা বলে তিনি ফোন নামিয়ে রাখলেন। ঘণ্টাখানেক পরে দরজায় বেল বাজল। তিনি দরজা খুলে দেখলেন অল্পবয়সী একটি ছেলে দাঁড়িয়ে আছে।  তিনি বললেন, “তুমি সমীর তো?  এসো।”

চার

অহিভূষণের গবেষণা-কক্ষ।  অবশ্য না বলে দিলে বোঝার উপায় নেই।  অহিভূষণ ও পৌষালী একটা বিশাল কম্পিউটার স্ক্রিনের সামনে বসে আছেন।  অহিভূষণকে দেখে তাঁর পঁয়ষট্টি বছর বয়েস বোঝার উপায় নেই, একটা সাদা ফতুয়া পরে শিরদাঁড়া টান করে বসে আছেন। অভিজাত চেহারা, মুখে প্রবল মেধা ও ব্যক্তিত্বের ছাপ। তুলনায় পৌষালী অনেক সাদামাটা, ছোটোখাট চেহারা, রঙ শ্যামলা-ঘেঁষা। মুখে কমনীয়তা’র ছাপ থাকলেও গাম্ভীর্যের
আড়ালে চাপা পড়েছে। বিশাল ঘরটির এককোণায় অস্বচ্ছ কাচ ও কাঠ দিয়ে ঘেরা একটি কিউবিকল মত, ভিতরে কী আছে দেখার উপায় নেই।

স্ক্রিনে জটিল একটি ত্রিমাত্রিক ছবি ভাসছে।  অহিভূষণ খুঁটিয়ে দেখছেন। তাঁর নির্দেশে পৌষালি ছবিটি এদিক-ওদিক ঘোরাচ্ছে বা জুম ইন করছে। কখনও নতুন ছবি নিয়ে আসছে। একটু পরে অহিভূষণ সন্তুষ্ট হয়ে পিছনে সরে এলেন।  চেয়ারটা পৌষালীর দিকে ঘুরিয়ে নিয়ে বললেন, “মূল প্রোগ্রামটা ভাল করে চেক করে নিয়েছ তো?”

পৌষালী সম্মতিসূচক ঘাড় নাড়ল। অহিভূষণ বললেন, “আমাদের কাজ শেষ।  এবার সময় হলে ফাইলটা ওদের পাঠিয়ে দিলেই হ’ল।”

পৌষালী ঘাড় নেড়ে বলল, “হ্যাঁ, স্যার।”

অহিভূষণ তাকে দেখছিলেন।  হঠাৎ বললেন, “তোমার কী হয়েছে বলো তো? এতবড়ো একটা কাজ হতে চলেছে,  কদিন থেকে দেখছি তোমার মধ্যে যেন উৎসাহ নেই।”

পৌষালী প্রমাদ গুনল। অহিভূষণ মোটেই আলাভোলা বৈজ্ঞানিক নন, সবদিকে নজর থাকে। কী বলবে বুঝতে না পেরে সে হেসে ফেলল। দেখা গেল হাসলে তার সাদামাটা মুখটিও দিব্যি ঝলমল করে ওঠে।  কিন্তু অহিভূষণ ভোলবার পাত্র নন,  তিনি কড়া চোখে তাকিয়ে আছেন। পৌষালী আমতা আমতা করে বলল, “স্যার আসলে অনেকদিন আগে আপনাকে যেটা বলেছিলাম, সেই ব্যাপারটাই মাথার মধ্যে ঘুরছে.. আমরা কি একটু তাড়াহুড়ো করে ফেলছি?”
অহিভূষণ বিস্মিত হয়ে বললেন, “কম্পিউটার সিমুলেশন বলছে সব ঠিক আছে।  হাতেকলমে পরীক্ষা করেও দেখা হয়েছে.. এরপরে আর অপেক্ষা করতে হবে কেন?”

পৌষালী একটু উত্তেজিত হয়ে বলল, “স্যার, প্রোগ্রাম তো এখনও মানুষেই লেখে! যেটা বিজ্ঞান জানে না, তা কম্পিউটার জানবে কী করে?  আর  হাতেকলমে পরীক্ষার ব্যাপারে তিনমাস সময় কি যথেষ্ট?”

অহিভূষণের মুখ থমথমে হয়ে গেল। পৌষালী একটু সিঁটিয়ে গেল। কিন্তু একটু পরে তাঁর মুখচোখ স্বাভাবিক হয়ে এল।  তিনি শান্তগলায় বললেন, “আরও কিছুদিন অপেক্ষা করলে যে ঝুঁকি থাকত না তা কে বলতে পারে?  আমি মনে করি কিছু ঝুঁকি নিয়েই বিজ্ঞানের এগিয়ে যাওয়া উচিত।  পরীক্ষা সফল হলে যে এই গ্রহে মানুষের জীবন পালটে যাবে সেটা ভাবছ না কেন?” 

পৌষালী মনে মনে ভাবল অল্পের উপর দিয়ে গেল। সে  আর কথা না বাড়িয়ে ঘাড় নেড়ে বলল, “তা ঠিক স্যার।”

পাঁচ

ছেলেটি তার ল্যাপটপের কীবোর্ডে দ্রুত হাত চালাচ্ছে। মাঝেমধ্যে মুখ তুলে স্ক্রিনে দেখছে এবং অস্ফুটে কিছু বলছে।  তার মুখে বিচিত্র সব অভিব্যক্তি খেলা করে যাচ্ছে। সোমক  কফির কাপ হাতে পিছনে এসে দাঁড়ালেন।  ছেলেটির কাঁধে হাত রেখে  স্মিত হেসে বললেন,  “কফিটা খেয়ে নাও।”

ছেলেটি ঘাড় ঘুরিয়ে তাঁকে দেখল৷ তারপর উঠে দাঁড়িয়ে কফিটা নিল। সোমক আর এক কাপ নিয়ে চেয়ার টেনে তার পাশে বসলেন।  হাসিমুখে বললেন, “শক্ত গাঁট  মনে হচ্ছে?”

ছেলেটি বলল, “এই ভদ্রলোকের বাড়ির নেটওয়ার্কে  অত্যন্ত আধুনিক একটা ফায়ারওয়াল বসানো হয়েছে। আমরা একে নেক্সট জেনারেশন ফায়ারওয়াল বলি।  ফায়ারওয়ালের একটা  কাজ হচ্ছে বাইরে থেকে আসা সব কল বা মেসেজ  কন্ট্রোল করা। এখানে মনে হচ্ছে একটা বিশেষ আই পি বাদে সব ব্লক করা আছে।  আমি সবরকম ভাবে চেষ্টা করে দেখছি যদি ফায়ারওয়ালটা এড়িয়ে ভিতরে ঢোকা যায়,  কিন্তু এখনও কিছু ক্লু পাইনি।”

সোমকের মুখে চিন্তার ছাপ পড়ল।  তিনি বললেন,  “আচ্ছা যে আই পি টা ব্লক করা নেই সেটা ট্রেস করা যায়?”
ছেলেটি হেসে বলল, “যায়, কিন্তু লাভ নেই।  আমি নিশ্চিত ওটা কোন প্রক্সি সার্ভারের আই পি। আসল লোক অন্য
জায়গায় বসে আছে।”

সোমক বললেন, “আচ্ছা ওই  আই পি’টা নকল করে ঢোকা যায় না?”

ছেলেটি সন্ধিগ্ন দৃষ্টিতে সোমককে একবার দেখল। তারপর বলল, “হ্যাঁ,যায়।  আমরা একে আই পি স্পুফিং বলি।
স্পুফিং অনেকরকম ভাবে করা যায়, কয়েকটা আমি চেষ্টা করেছি। তবে ওই যে বললাম, ফায়ারওয়ালটা অত্যন্ত বুদ্ধিমান, শুধু আই পি  অ্যাডড্রেস ছাড়াও অনেক কিছু চেক করে আটকে দিচ্ছে। দেখি।”

সোমক ছেলেটিকে আবার দেখলেন। কত বয়েস হবে? বড়োজোর সাতাশ আঠাশ।  সাধারণ চেহারা, খালি চোখ দুটি ঝকঝক করছে। তাদের সাইবার সেলের মতে এ-ই নাকি কলকাতার সেরা নেটওয়ার্ক সিকিওরিটি এক্সপার্ট।

তিনি ছেলেটিকে থামস আপ দেখিয়ে উঠে  এলেন। হাতে সময় বেশি নেই।

ছয়

অহিভূষণের ফোন বাজছে।  হোয়াটসঅ্যাপ কল।  খালি এই নম্বরটাই এখন খোলা আছে। তিনি ফোন ধরে   বললেন, “বলুন।”
ও প্রান্ত থেকে একটা কন্ঠ বলল, “দিস ইজ জাস্ট আ রুটিন কল ড: সান্যাল। আশা করি সব কিছু ঠিকমত চলছে!”
অহিভূষণ বললেন, তাই তো মনে হয়।   কাল সকালে ওদের একবার চেক করে  আমরা ফাইলটা আপনাদের পোর্টালে তুলে দেব।  তারপর আপনাদের কাজ…”

“মাচ অ্যাপ্রিসিয়েটেড ডক্টর। আমরা কাজ শেষ করে আপনাদের নিয়ে একটা প্রেস কনফারেন্স ডাকব। সেখানে সারা পৃথিবী থেকে সায়েন্স- রিপোর্টার ও কয়েকজন বিশিষ্ট বৈজ্ঞানিকও থাকবেন।”

অহিভূষণ হেসে বললেন, “অবশ্যই।”

ও-প্রান্ত কয়েক মুহূর্ত  চুপ করে রইল। তারপর বলল, “ড: সান্যাল,  আপনার অনুমতি নিয়ে একটা কথা জানাতে চাই। আমাদের সূত্র বলছে সরকার থেকে একজন রিটায়ার্ড পুলিশ অফিসারকে আপনার সঙ্গে কথা বলার দায়িত্ব দিয়েছে।  উনি আপনার বিশেষ বন্ধুও।”

অহিভূষণ বিস্মিত হয়ে বললেন,  “সোমক?”

ও-প্রান্ত বলল, “হ্যাঁ।  আমরা আপনাকে একটা  অনুরোধ করব.. এই প্রোজেক্টে  গত একবছর ধরে আমরা কঠোর গোপনীয়তা বজায় রেখেছি। এইসময় বাইরের কেউ না জানলেই ভাল হয়।  ইট ইজ আ ম্যাটার অফ টুয়েলভ আওয়ারস অনলি। ফাইনাল ডিসিশন ইজ ইওরস।”

অহিভূষণ বললেন, “আমি একমত। তাছাড়া এখন কারও পক্ষেই আমার সঙ্গে যোগাযোগ করার উপায় নেই।  কাজেই..”
ও- প্রান্ত বলল, “থ্যাঙ্ক ইউ সো মাচ ডক্টর।”

কলটা কেটে গেল।  অহিভূষণের ঠোঁটের কোণায় এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল।  সোমক তার প্রিয় বন্ধুদের একজন।  অসম্ভব শার্প।  অনেকদিন দেখাসাক্ষাৎ হয় না। কাল প্রেস কনফারেন্স হয়ে গেলে ওকে ডিনারে ডাকা যেতে পারে। তিনি নিশ্চিত তাঁর কাজের তাৎপর্য সোমক ঠিকই বুঝবে।

সাত

“কেমন আছিস?”

বেশ কিছুক্ষণ ওদিক থেকে সাড়া নেই। তারপর চ্যাটে দেখাল  “অহি ইজ টাইপিং।”

সোমকের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটি খুশিতে শ্বাস টানল। সোমক ডান হাত দিয়ে তার  পিঠে আলতো করে চাপ দিলেন।  ছেলেটি  বলল, “তাড়াতাড়ি করবেন স্যার, ওরা যদি  মনিটর করে,  বুঝতে পারলেই ব্লক করে দেবে।”

এবার অহিভূষণের মেসেজ এল, “তুই হ্যাকিং করতে  কবে শিখলি?” সঙ্গে একটা বিস্ময়সূচক ইমোজি।
সোমক একটা স্মাইলি পাঠিয়ে দ্রুত লিখলেন, “তোর সঙ্গে  একবার দেখা করা যায়?  বেশি সময় নেব না।”

লিখেই মনে হল, অবান্তর প্রস্তাব।  তিনি সরকারের হয়ে কাজ করছেন জেনেও অহি তাঁকে ডাকার ঝুঁকি নেবে কেন? কিন্তু এ ছাড়া আর কি করার ছিল? 

তাঁকে অবাক করে দিয়ে অহিভূষণ লিখলেন, “চলে আয়। তবে আজকের রাতটা থেকে যাস।”
সোমক কিছু লেখার আগেই পিং করে একটা শব্দ হ’ল।  ছেলেটি বলল, “স্যার, ওরা কলটা ব্লক করে দিয়েছে।” সোমক ছেলেটির হাত ধরে একবার জোরে ঝাঁকুনি  দিলেন। তারপর দ্রুত বাইরের পোশাক পরে প্রায় ছুটে বেরিয়ে গেলেন।  তার বাড়ি থেকে ড্রাইভ করে যেতে আধঘণ্টার মত লাগবে।

আট

গবেষণাকক্ষ।  সোমক, অহিভূষণ ও পৌষালী ঘরের মাঝখানে তিনটে চেয়ার টেনে বসে আছেন। একটু আগে জাপটা-জাপটি ও উচ্ছাস বিনিময় পর্ব হয়ে গেছে। পৌষালী চটপট তিনকাপ কফি বানিয়ে এনেছে, খেতে খেতে আড্ডা চলছে।

একটু পরে অহিভূষণ কফি শেষ করে কাপটা নামিয়ে রাখলেন।  সোমকের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বললেন, “বল।”
সোমক সোজা ব্যাটে খেলবেন ঠিক করে এসেছেন।  তিনি পালটা হেসে বললেন, “কী বলব?  তুই সবই জানিস।  তবে বিশ্বাস কর তোর কাজে বাধা দেওয়ার ইচ্ছে বা ক্ষমতা কোনটাই আমার নেই। তবে খবরটা জেনে প্রচন্ড কৌতুহল হচ্ছিল তাই ভাবলাম তোর সঙ্গে কথা বলি।”

অহিভূষণ কটমট করে তাকিয়ে বললেন, “তাই সিকিওরিটি এক্সপার্ট ডেকে আমার নেটওয়ার্ক হ্যাক করতে হল?” 
সোমক ধরা পড়ে গিয়ে হেসে ফেললেন। পৌষালীও হেসে ফেলল। স্যার যে তাঁর এই বন্ধুটিকে বিশেষ পছন্দ করেন তাঁর কথা শুনেই বোঝা যাচ্ছে।

অহিভূষণ সামনে ঝুঁকে পড়ে সোমকের কাঁধে বিশাল চাপড় মেরে বললেন, “নে তোর কৌতুহল মিটিয়েই দিচ্ছি।  তবে আজ রাতে এখানেই থাকবি, মনে আছে তো?”

সোমক ঘাড় নাড়লেন। অহিভূষণ পৌষালীর দিকে তাকিয়ে বললেন, “কোথা থেকে শুরু করা যায় বলো তো?”
পৌষালী একটু ভেবে বলল, “স্যার আপনি আইডিয়াটা পেয়েছিলেন বোধহয় ব্লাইন্ডসাইট ব্যাপারটার থেকে।”

অহিভূষণ খুশি হয়ে বললেন, “ঠিক। তারপর সোমকের দিকে তাকিয়ে বললেন, “শুনেছিস কথাটা?”

সোমক ঘাড় নেড়ে বললেন “হ্যাঁ। বানর বা মানুষের ভিসুয়াল কর্টেক্স বলে ব্রেনের যে অংশটি দৃষ্টিশক্তির জন্য দায়ী দেখা গেছে সেটি ক্ষতিগ্রস্ত হলেও একধরণের দৃষ্টি থেকে যায়। যেমন, চোখে আলো ফেললে সে আলোর উৎস বা নড়াচড়া বুঝতে পারে। সামান্য অভ্যাসের পর রাস্তা দিয়ে হেঁটেও যেতে পারে। কিন্ত কী করে এটা করছে সে সম্বন্ধে তার কোনো ধারণা নেই কারণ তার চেতনায় শুধুই অন্ধকার। এটাকেই অচেতন দৃষ্টি বা আনকনশাস ভিশন বলা হয়, এবং গোটা ব্যাপারটাকে ব্লাইন্ডসাইট। এটা কী করে হয় তা নিয়ে বৈজ্ঞানিকদের মধ্যে মতভেদ আছে।”

পৌষালীর মুখ প্রায় হাঁ হয়ে গেছে। অহিভূষণও মজা পেয়েছেন। “বললেন, শালা তুই পুলিশ না হয়ে গবেষণার লাইনে এলে আমাদের ভাত মারা যেত। যাকগে, এই ব্যাপারটা এত গুরুত্বপূর্ণ কেন?”

সোমক হেসে বললেন, “আমার বিদ্যার বাইরে চলে যাচ্ছে। তবে মোটামুটি যা জানি এই ঘটনাটার তাৎপর্য হল যে আমাদের রেটিনা থেকে সিগন্যাল শুধু ভিশ্যুয়াল কর্টেক্সে যাচ্ছে না, ব্রেনের অন্য কোথাও যাচ্ছে এবং সেখান থেকে আমাদের  অগোচরেই  আমাদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে নির্দেশ যাচ্ছে।”

অহিভূষণ বললেন, “মোটামুটি ঠিকই বলেছিস। এ নিয়ে অনেক থিওরি ছিল তবে কয়েক বছর আগে আমার বন্ধু বিশিষ্ট নিউরোসায়েন্টিস্ট ড: জেরাল্ড একটা পেপারে সংশয়াতীতভাবে দেখিয়েছেন আমাদের ব্রেনে ভিশন ফর  পারসেপশন (সচেতনভাবে দেখা) এবং ভিশন ফর অ্যাকশনের জন্য দুটি আলাদা নিউরাল পাথওয়ে রয়েছে।  এ-দুটির মধ্যে একটি যদি ক্ষতিগ্রস্ত হয় তাহলে ব্লাইন্ডসাইট বা অন্য বিচিত্র পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।

“তখন থেকেই  আমি ব্যাপারটা নিয়ে ভাবতে থাকি।  আমার মনে হয়  ব্লাইন্ডসাইটের মত ব্লাইন্ডহিয়ারিং, ব্লাইন্ডস্মেল এগুলিও সম্ভব। অর্থাৎ সেক্ষেত্রে  লোকটির আমাদের মত শোনার বা ঘ্রাণের অনুভূতি থাকবে না কিন্তু তার ব্রেনের একটা অংশ যান্ত্রিকভাবে প্রয়োজনমত তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে নির্দেশ দিয়েই যাবে৷ নিউরোসায়েন্সের ভাষায় এটাকে ‘অটোনমিক রেসপন্স’ বলে। অনেক কোটি বছর আগে আদিম প্রাণীরা এইভাবেই বেঁচে থাকত। মানুষের ক্ষেত্রেও  দৃষ্টি, শ্রুতি বা ঘ্রাণের অনুভূতির জন্য যে নিউরাল পাথওয়ে সেটা ব্লক করে দেওয়া সম্ভব। আপাতদৃষ্টিতে এটা অসার চিন্তা কারণ এই অনুভূতিগুলি না থাকলে মানুষ জোম্বি হয়ে যেত, বেঁচে থাকাই অর্থহীন হ’ত। কিন্তু বিজ্ঞানের কাছে সব চিন্তা বা তথ্যই গুরুত্বপূর্ণ।  

“ভাবতে ভাবতে একদিন অন্য একটা সম্ভাবনা আমার মাথায় আসে।  কিছুদিন  প্রাথমিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখি এটা সম্ভব। তারপর গত দু-বছর ধরে কাজ চলছে। আজকাল উন্নতমানের গবেষণার খরচ প্রচুর।  তাই একটি বিদেশী প্রতিষ্ঠানের সাহায্য নিয়েছি। আর্থিক ও অন্যান্য ঝামেলার দিকগুলি এরা সামলাচ্ছে। কাল সকালে  আমার কাছ থেকে গ্রিন সিগন্যাল পেলে এরা প্রেস কনফারেন্স ডাকবে।”

সোমক আর থাকতে না পেরে অধৈর্য্যভাবে বললেন, “বিষয়টা কী?”

অহিভূষণ বললেন, “বলার আগে তোকে একটা জিনিস দেখাই। আয়।”

তিনি  সোমককে নিয়ে ঘেরা জায়গাটার দিকে গেলেন।  পৌষালীও এল।  ঢোকার জন্য একটা ছোটো দরজা, সেটায় তালা দেওয়া।  পৌষালী চাবি দিয়ে তালাটা খুলল।  ভিতরে আলো জ্বলছে।  সামনে একটা কালো পর্দা,  সেটা টেনে সরিয়ে দিতে দেখা গেল একটা টেবিলের উপর দুটি বেশ বড়ো কাচের বাক্স।  সোমক অবাক হয়ে দেখলেন,  একটিতে একটি খরগোশ আর অন্যটিতে একটি বানর বসে বসে ঝিমোচ্ছে। তাঁদের সাড়া পেয়ে নড়েচড়ে বসল।
পৌষালী বাক্সের ঢাকনা খুলে খরগোশটির দুই লম্বা কানের মাঝে আদর করে চুলকে দিল। আরামে তার চোখ বুজে এল। বানরটি ওদিকে থেকে জুলজুল করে দেখছে। পৌষালী তার বাক্সের সামনে রাখা বাটি থেকে কয়েকটি ছোলা নিয়ে তাকে দিল, সে মহানন্দে সেগুলি মুখে পুরে চিবোতে লাগল।

অহিভূষণ বললেন, “এবার দ্যাখ।”

তাঁর হাতে একটা ছোটো স্টিলের রড।  তার মুখটা  সূঁচের মত তীক্ষ্ণ।  তিনি খরগোশের খাঁচার দিকে এগিয়ে গেলেন।  দরজা খুলে রড শুদ্ধ হাত ভিতরে ঢুকিয়ে দিলেন। সোমক। আঁৎকে উঠে বললেন, “কী করছিস?”

অহিভূষণ উত্তর না দিয়ে এবার সূচলো অংশটা সজোরে খরগোশটির গায় বিঁধিয়ে দিলেন। তার সাদা চামড়ায় ছোটো একবিন্দু রক্ত ফুটে উঠল। সোমক অবাক হয়ে দেখলেন, খরগোশটির বিশেষ কোন প্রতিক্রিয়া  নেই। সে শুধু  চট করে একপাশে সরে গেল। অন্যদিকে পৌষালী একটা ছোটো মশালের মত জিনিস জ্বালিয়ে বানরটির গায়ের খুব কাছাকাছি নিয়ে গেল, আরেকটু হলেই চামড়া পুড়ে যাবে। বানরটির মুখেচোখে যন্ত্রণার বা অন্য কোন অনুভূতি ফুটল না। সে শুধু যান্ত্রিকভাবে একপাশে সরে গেল। পৌষালী তাকে মশাল নিয়ে তাড়া করল, সে ক্রমশ সরে যেতে লাগল। কিন্তু মুখেচোখে বিরক্তি বা প্রতিবাদের কোন চিহ্ন নেই।”

অহিভূষণ সোমকের দিকে তাকিয়ে বললেন, “কী বুঝলি?”

সোমক স্তম্ভিত।  তিনি কোনরকমে অস্ফুটে বললেন, “ব্লাইন্ড পেইন।”

অহিভূষণ সোমকের পিঠ চাপড়ে দিয়ে বললেন, “ঠিক বলেছিস। অবশ্য পৌষালী ব্যাপারটার একটা অন্য নাম দিয়েছে, পেইনলেস পেইন। কাল প্রেস কনফারেন্সে আমরা এই টার্মটাই ইউজ করব ভেবেছি। আয়, বাইরে গিয়ে বসি।”
দরজায় তালা দিয়ে তাঁরা তিনজনে ড্রয়িংরুমে গিয়ে বসলেন।  পৌষালী জিগ্যেস করল,  স্যার আপনি চা, কফি কিছু নেবেন?
সোমক বললেন, “মন্দ হয় না। মাথার জট ছাড়াতে হবে।”

পৌষালী কিচেনে গেল।  অহিভূষণের মুখে মৃদু হাসি।   তিনি সোমককে বললেন, “এবারে বল।”

তিনি ধীরেধীরে বললেন, “যন্ত্রণা বড়ো কষ্টের, তবু আমাদের বেঁচে থাকতে সাহায্য করে। আগুনে, জলে বা কাটাছেঁড়ায় শরীর যদি জানান না দিত, বাঁচা মুশকিল হয়ে যেত। শুনেছি একধরণের রেয়ার জেনেটিক অসুখ থাকলে এই সমস্যা হয়, তারা বেশিদিন বাঁচে না। তোর পোষ্যদের দেখে মনে হল ওদের যন্ত্রণার বোধ নেই অথচ শরীর আত্মরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় কাজ ঠিকই করে যাচ্ছে।”  

অহিভূষণের চোখমুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। প্রিয় বন্ধুটি যে তাঁর কাজের গুরুত্ব বুঝতে পেরেছেন এটা তাঁর কাছে বড়ো প্রাপ্তি।

পৌষালী চা নিয়ে এল। সোমক চায়ে চুমুক দিয়ে বললেন, “ব্লাইন্ডসাইটের সঙ্গে ব্যাপারটার মিল কতকটা ধরতে পারছি, তবু একটু খুলে বল।”

অহিভূষণ পৌষালীর দিকে তাকালেন। পৌষালী একটু ভেবে নিয়ে বলল, “আংকল, আমাদের শরীরের ত্বক, পেশী ও অন্যত্র পেইন-রিসেপটর সেল থাকে। পরীক্ষায় দেখা গেছে এগুলি থেকে ব্রেনের কর্টেক্সের বিশেষ একটি অঞ্চলে (অ্যান্টেরিয়র সিঙ্গুলেট কর্টেক্স  বা এ সি সি) সঙ্কেত পৌঁছলে তবেই আমাদের  যন্ত্রণা অনুভব করি। তবে এতদিন বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল এই যন্ত্রণার ভিত্তিতেই আমাদের শরীর রিঅ্যাক্ট করে,  যেমন হাতে গরম কিছু লাগলে আমরা বুঝতে পারি এবং হাত সরিয়ে নি। স্যার পরীক্ষা করে দেখেছেন এটা ঠিক নয়, ব্যাথার সঙ্কেত এসিসি ছাড়াও একই সঙ্গে মস্তিষ্কের অন্য অঞ্চলেও পৌঁছয় এবং আমাদের শারিরীক প্রতিক্রিয়া তার ভিত্তিতেই হয়। অর্থাৎ যন্ত্রণা অনুভব না করেও নিজেকে রক্ষা করা সম্ভব।”

পৌষালী থেমে গিয়ে অহিভূষণকে বলল, “স্যার এরপর আপনি বলুন।”

অহিভূষণ বললেন, “আমি তখনই ঠিক করি ব্রেনের প্রথম পথটি  নিষ্ক্রিয় করে দিয়ে দেখব ব্যাপারটা কী দাঁড়ায়।  ব্রেনে এত সূক্ষ্ম সার্জারি করা প্রায় অসম্ভব তাই একটাই উপায় ছিল যে মস্তিষ্কের এই বিশেষ  প্রক্রিয়া যে এক বা একাধিক জিন নিয়ন্ত্রণ করে তাদের সনাক্ত করে  নিষ্ক্রিয় করে দেওয়া।”

সোমক মন্ত্রমুগ্ধের মত শুনছেন। অহিভূষণ বলে চললেন, “এক বছর আগে খরগোশদের  নিয়ে পরীক্ষা শুরু করি।  কাজটা সহজ ছিল না। কিন্তু পৌষালীকে নিয়ে দীর্ঘদিন চেষ্টা  করার পর আজ থেকে তিনমাস আগে আমরা অবশেষে একটি জিনকে সনাক্ত করতে পারি।  কিন্তু এর ফলে প্রাণীটির শরীরে অন্য কোন প্রতিক্রিয়া হবে কিনা সেটা দেখার জন্য আমরা ঠিক করি খরগোশটিকে আমরা তিনমাস পর্যবেক্ষণে রাখব।  ওই একই দিনে আমরা একটি বাঁদরের শরীরেও একই পরিবর্তন করি। এই তিনমাস কালকে শেষ হবে।”

সোমক রুদ্ধশ্বাসে বললেন, “তারপর?”

অহিভূষণ বললেন, “তারপর লজিক্যালি যা হওয়া উচিত।  হিউম্যান ট্রায়াল।  আমাদের দেশে সেটা নিষিদ্ধ। আমি যাদের সঙ্গে কাজ করছি তারা একটি দেশে এই কাজটি করার ব্যবস্থা করেছে যেখানে এই পরীক্ষা আইনত করা যায়।  কাল সকালে আমাদের কাছ থেকে সবুজ সঙ্কেত পেলে তারা আই ভি এফ পদ্ধতিতে তৈরি একটি ভ্রূণের জিনোমে  এই পরিবর্তন করবে এবং সেটি একজন সারোগেট মাদারের গর্ভে স্থাপন করবে। সঙ্গেসঙ্গে প্রেস কনফারেন্স ডেকে এই ট্রায়ালের কথা আনুষ্ঠানিক ভাবে গোটা পৃথিবীকে জানিয়ে দেওয়া হবে।”

সোমক মনে মনে চমকে উঠলেন। জিন-থেরাপি বা পরীক্ষা-নিরীক্ষা এখন যা করা হয় তা সবই আক্রান্ত রোগীর শরীরে বিশেষ বিশেষ সেলে।  সেই পরিবর্তন  পরবর্তী প্রজন্মে প্রবাহিত হয় না। অহিভূষণ যা করতে চলেছেন তাকে চলতি কথায় ‘ডিজাইনার বেবি” বলা হয়। এক্ষেত্রে পরিবর্তনটি ভূমিষ্ঠ শিশুটির এবং তার সন্তানদের মধ্যে বংশপরম্পরায় চলতে থাকবে। জিন-থেরাপির এই পদ্ধতি বিশ্বের অধিকাংশ দেশেই আইনসিদ্ধ নয়। তিনি বললেন, “এটা কোনো ভলান্টিয়ারের  শরীরে সরাসরি করা যেত না?”

অহিভূষণ বললেন, “যেত, কিন্তু তাতে দীর্ঘমেয়াদী ফল পাওয়া যেত কিনা জানি না। তুই তো জানিস আমাদের শরীরের কোষ বা সেলগুলি কিছুদিন পরপর নতুন সেল তৈরি করে নিজেদের ধ্বংস করে ফেলে। একটা সময় পর এই নতুন সেলগুলিতে ডিএনএ সিকোয়েন্সের যে পরিবর্তন করা হয়েছিল তা বজায় থাকবে কিনা আমরা এখনও নিশ্চিত নই। আমি সে ঝুঁকি নিতে চাইনি। মনে রাখিস জিন থেরাপি খুব বেশিদিন শুরু হয়নি। কিন্তু ভ্রূণে যে পরিবর্তন করা হবে তা অবশ্যই পার্মানেন্ট হবে।

সোমক একটুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, “আরও কিছু প্রশ্ন থেকে যায়। অটোনমিক রেসপন্স দিয়ে কি সব সমস্যার সমাধান হবে? কখনও আমাদের বাইরে থেকে সাহায্যের প্রয়োজন হয় যেমন অসুখ-বিসুখ হলে চিকিৎসকের। কিন্তু ব্যাথার অনুভূতি না থাকলে হয়তো সমস্যা বুঝতে বড়ো দেরি হয়ে যাবে।  দ্বিতীয়ত,  যন্ত্রণাকে আমরা ভয় পাই বলেই সম্ভাব্য সমস্যা নিয়ে আমরা চিন্তা-ভাবনা করি, ঠেকাতে পরিকল্পনা করি। সেই তাগিদ কি তখনও থাকবে?”
অহিভূষণ বললেন, “ভালো প্রশ্ন, তবে এসব নিয়ে আমরাও  ভেবেছি। প্রথমত ব্যাথা-বেদনাই রোগের একমাত্র উপসর্গ নয়,  অন্য উপসর্গও থাকে। দ্বিতীয়ত, ভাবলে দেখবি সময়ের সঙ্গে মানুষ অনেক সহজাত ক্ষমতা হারিয়েছে কিন্তু প্রযুক্তি সেই অভাব পূর্ণ করেছে। কিছুদিন পরে হয়তো আমাদের সব ভাইটাল প্যারামিটারই চব্বিশ ঘণ্টা মনিটর হতে থাকবে, মানুষকে কখন ডাক্তারের কাছে যেতে হবে যন্ত্রই বলে দেবে। আর প্ল্যানিং-এর কথা যেটা বললি সেটাও তর্কসাপেক্ষ।  অনেক নিম্নস্তরের প্রাণী যাদের হয়তো সেই অর্থে চেতনা বা যন্ত্রণার বোধ নেই তারাও কিন্তু  পুরোপুরি তাৎক্ষণিক প্রক্রিয়ার উপর নির্ভর করে বাঁচে না। সেইসঙ্গে এটাও মনে রাখতে হবে আমাদের. সব আচার- ব্যবহার কিন্তু জেনেটিক্যালি ঠিক হয় না, অনেক কিছুই শিক্ষার উপরেও নির্ভর করে।”

সোমক চুপ করে রইলেন।  অহিভূষণ তাঁর কাঁধে হাত রেখে বললেন, “দ্যাখ, ঝুঁকি নেই এমন  বলছি না।  কিন্তু  তো ঝুঁকি নিয়েই এগিয়েছে!  মনে করে দ্যাখ আমেরিকা যখন প্রথম পারমাণবিক বিস্ফোরণ ঘটায় অনেকে ভেবেছিলেন চেইন রিঅ্যাকশনে পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। তাছাড়া, এই শিশুটি অবশ্যই আমাদের পর্যবেক্ষণে থাকবে। পরবর্তীকালে এই প্রযুক্তি কোথায় কখন  ব্যবহার হবে বিভিন্ন দেশের সরকারই ঠিক  করবে।  মনে রাখিস,  বিজ্ঞানীর কাজ সমাজ পাল্টানো নয়৷ সমাজকে নতুন পথের দিশা দেখানো।”

সোমক চুপ করেই রইলেন।   হয়তো অহিভূষণের কথাই ঠিক, কিন্তু  এত বড়ো একটা ব্যাপার নিয়ে বিজ্ঞানী মহলে আরও আলোচনা ও বিতর্ক হলে ভালো হত। তিনি আড়চোখে পৌষালীকে দেখলেন। সে ভাবলেশহীন মুখে বসে আছে।

অহিভূষণ তাঁর পিঠে চাপড় মেরে বললেন, “চল, এবার খেয়ে-দেয়ে শুয়ে পড়া যাক।  কাল আবার ভোরে উঠতে হবে।”

রাতে সোমকের ভাল ঘুম হল না। অনেক ছেঁড়াছেঁড়া স্বপ্ন দেখলেন। একবার দেখলেন বিদেশের কোন হাসপাতালে অসংখ্য রুগী বিছানায় শুয়ে যন্ত্রণায় ছটফট করছে।  কয়েকজন চিৎকার করে বলছে, “সিস্টার, কিল মি।” এককোণায় দাঁড়িয়ে অল্পবয়সী একটি নার্স হাউহাউ করে কাঁদছে। ঘুম ভেঙে তাঁর মনে হল হিরোশিমার উপর একটি ডকুমেন্টারিতে এরকম একটি দৃশ্য দেখেছিলেন। তিনি একগ্লাস জল খেয়ে আবার ঘুমোবার চেষ্টা করলেন। তারপর
দেখলেন অগণিত সদ্যজাত বিকলাঙ্গ শিশু আকাশের দিকে হাত তুলে যেন  নীরবে প্রতিবাদ জানাচ্ছে। ভোরের দিকে একবার দেখলেন পৌষালি যেন তাঁর ঘরে এসেছে।  

ভোর পাঁচটা নাগাদ অহিভূষণ নিজেই চা-টা করে সবাইকে ডেকে তুললেন। চা-পর্ব শেষ হলে তিনি বললেন, “দাঁড়া ও দুটোকে একবার দেখে আসি।”

একটু পরে ফিরে এসে বললেন, “দিব্যি আছে।” পৌষালীকে বললেন, “চলো, ফাইলটা ওদের পাঠিয়ে দিয়ে আসি।”
সোমক উঠে দাঁড়ালেন কিন্তু পৌষালীর  উঠবার কোন লক্ষণ নেই। অহিভূষণ অধৈর্য হয়ে বললেন, “কী হল তোমার?”
পৌষালী তাঁর দিকে তাকিয়ে একবার নীচের ঠোঁট কামড়ে ধরল, তারপর ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল।  কাঁদতেই কাঁদতেই বলল, “ফাইলটা.. আমি ডিলিট করে দিয়েছি।”

অহিভূষণ কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইলেন।  তাঁর মুখে  বিশেষ ভাবান্তর নেই,  যেন কথাটা তিনি শুনতেই পাননি।  তারপর  তিনি পৌষালির দিকে হাত বাড়িয়ে শান্তভাবে বললেন, “ব্যাক আপটা…”

পৌষালী ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলল, “সেটাও।”

অহিভূষণ আরও কিছুক্ষণ  চুপ করে রইলেন, তারপর তাঁর মুখচোখ পলকে  হিংস্র হয়ে উঠল, তিনি   পৌষালীর দিকে এক পা এগিয়ে গেলেন। সোমক দ্রুত  দুজনের মাঝে গিয়ে দাঁড়ালেন। অহিভূষণের  দিকে তাকিয়ে দেখলেন তাঁর   মুখ থেকে ধীরেধীরে রক্ত সরে যাচ্ছে। তিনি প্রায় কাঁপতে কাঁপতে একটা চেয়ারে বসে পড়লেন। সোমক তাঁর পিঠে হাত রাখলেন। তাঁর  ইঙ্গিতে পৌষালী  ঘর থেকে চলে গেল।

টেবিলে রাখা অহিভূষণের ফোনটা বাজছে। অহিভূষণ অসহায় ভাবে তাকিয়ে রইলেন।   সোমক ফোনটা ধরে একপাশে সরে গেলেন।  ওপ্রান্ত থেকে একটা বিদেশী কন্ঠ বলল, “আর ইউ রেডি ড: সান্যাল? উই আর ওয়েটিং ফর দ্য ফাইল।”
সোমক চাপা গলায় বললেন, “দিস ইজ  সোমক, হিজ ফ্রেন্ড।  হি ইজ নট ওয়েল। হি উইল স্পিক টু ইউ লেটার।”

নয়

দু’দিন পরের কথা। সোমক অহিভূষণকে নিজের বাড়িতে এনে রেখেছিলেন। তিনি শক্ত মনের মানুষ, ধাক্কাটা মোটামুটি সামলে নিয়েছেন। তিনি কাল ফিরে যাবেন। পৌষালী তার বাড়িতে ফিরে গেছে। এজেন্সির একটি লোক বাড়ির দেখাশুনো করছে ও পোষ্যদুটির দিকে খেয়াল রাখছে। অহিভূষণ ফিরে গিয়ে এই গবেষণাই পুনরুদ্ধার করবেন না নতুন কোন কাজে হাত দেবেন সেটা বলেননি। তবে প্রথম কাজটা সহজ হবে না। সোমকের ধারণা পৌষালী সাপোর্টিং ফাইলগুলিও নষ্ট করে দিয়েছে।

দশটা বাজে। সোমক ব্রেকফাস্ট সেরে অহিভূষণকে বলে একটু বেরোলেন। বাড়ির কাছেই ব্যাঙ্ক, সোমক ঢুকে লকারের দায়িত্বে থাকা পরিচিত ব্যাঙ্ক-কর্মীটির কাছে গেলেন। ছেলেটি হাসিমুখে বলল, “আসুন স্যার, অনেকদিন পরে এলেন।”

সে সই সাবুদ করিয়ে সোমককে লকার-রুমে নিয়ে গিয়ে নিজের চাবি ঘুরিয়ে দিয়ে চলে এল।  সোমক এবার নিজের চাবি লাগিয়ে লকার খুললেন, পকেট থেকে ছোটো একটি প্যাকেট বার করলেন।  

ভিতরে একটি মাইক্রো ডিসক। সেদিন রাতে পৌষালী দিয়ে গিয়েছিল। এছাড়া পুরো ব্যাপারটা নিয়ে সোমকের নিজের হাতে লেখা ছোটো একটি নোট। সোমক সেটি ভিতরে রেখে লকার বন্ধ করে দিলেন।
বেরোনো’র সময় ব্যাঙ্কের  ছেলেটি  হাসিমুখে বলল, “বসুন স্যার,  একটু  চা খেয়ে যান।”

সোমক বললেন, “আজ থাক, পরে কখনও।”

ছেলেটি বলল, “আসবেন মাঝেমধ্যে। আজকাল সব অনলাইন হয়ে যাওয়ায় লোকজনের দেখাই পাওয়া যায় না।”

সোমক হাসলেন, বললেন, “হ্যাঁ, আসব। আসতে তো হবেই!”

ছবি- মৌসুমী রায়

জয়ঢাকের গল্পঘর

এই লেখকের কুড়িটি কিশোর কাহিনির সঙ্কলন ‘ভয়ের ভাক্সিন”  বইটি সম্বন্ধে জানতে ও  জয়ঢাক প্রকাশনের বুকস্টোর থেকে অর্ডার দিতে নীচের ছবিতে ক্লিক করুন

bhoyvacbook

Leave a Reply