গল্প-পায়রা-শান্তনু বন্দ্যোপাধ্যায়-শরৎ২০২৪

মন্টি, বায়স,কালু, মনার বাগান

golpopayra

আজকাল এইই হয়েছে সঙ্গীতার। সামান্য আওয়াজেই ঘুম ভেঙে যাচ্ছে। এবারে গরম একটু বেশিই পড়েছে, সেজন্যই কি? তাই বা কী করে হবে, গরম তো আর কম দেখেনি সে; রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, হরিয়ানা কোথায় না থেকেছে, তারপর এখানে, কলকাতায় এসে থিতু হয়েছে, তাও নয় নয় করে কুড়ি বছর কেটে গেছে। প্রত্যেক বছরেই টিভি-তে বলে এবছরই পারদ সর্বোচ্চ মান ছুঁয়েছে। এক বাঁধা বুলি, ‘গত পঞ্চাশ বছরে আজ তাপমাত্রা ছিল সর্বোচ্চ!’ যত্তোসব! টিভি দেখলে আজকাল বিরক্তির বদলে হাসি পায়। গরমের কারণে কোনোকালে ঘুমের ব্যাঘাত ঘটেনি। তাও ও ভাবে, বয়েস বাড়ছে তো!

ঘুম নিয়ে রোহিতাশ্ব মাঝে সাঝে ঠাট্টা করেছে তবে তা সিরিয়াস কিছু নয়। সঙ্গীতা ঘুমোতে ভালোই বাসে। ফাঁক পেলেই ঘুমিয়ে নেয়। ওর সহজাত এইটা। ইনসমনিয়া ওর ধাতে নেই। কিন্তু ইদানীং অল্প আওয়াজেই (আওয়াজই তো! নাকি অন্য কিছু?) ঘুম ভেঙে চমকে উঠছে ও। রোহিতাশ্ব বেশ কিছুদিন আগে মজা করে বলেছিল, “আরে তোমার নিজের নাকের ডাকে নিজেই উঠে পড়েছ!”

কে জানে তাই হবে হয়তো! তবে ইদানীং ব্যাপারটা যেন আরও বেড়েছে দেখে রোহিতাশ্ব অবধি গম্ভীর মুখ করে মন্তব্য করল, “ব্যাপারটা গুরুতর, গভীর কোনো মনস্তাত্বিক কারণ হতে পারে!”

“ধ্যাৎ, তোমার যত কথা!”

সঙ্গীতা ওর স্বামীর কথায় আমল না দিলেও বিষয়টা ওকে একটু হলেও ভাবিয়েছে। কিন্তু ও-ও বিশেষ কূলকিনারা পায়নি।

রোহিতাশ্ব সামান্য অলস প্রকৃতির। নড়ে বসবে না। সবসময় একটা ভাবের ঘোরে থাকে। সঙ্গীতা প্রশ্রয় দেয় ঠিকই কিন্তু কখনো-সখনো রাগ হয়ে যায়। বিশেষ করে সংসারের এটা-সেটা সামলাতে সামলাতে যখন হাঁফিয়ে ওঠে তখন। রোহিতাশ্ব যে একেবারে সাহায্য করে না বা করতে চায় না তেমনটা নয়। তা বললে ভুলই হবে কিন্তু ওই যে, নিজে থেকে নড়ে বসবে না, ওকে ঠেলে বলতে হবে। বললে, পাহাড় মাথায় করবে। অথচ না বললে, উঁহু একটি কুটোও নাড়বে না। সঙ্গীতা কতবার বলেছে, “নিজে একটু দেখেশুনে সংসারে কোন কাজটা দরকার সেটা বুঝে নিয়ে করে দিতে তো পারো!”

তো তার একই উত্তর, “নো ম্যাডাম! আমাকে বলতে হবে, অমুকটা করো!”

আরও একটা অভিযোগ আছে সঙ্গীতার। রোহিতাশ্ব বড্ডো চেঁচিয়ে কথা বলে। সামনে এসে নীচুস্বরে বললে হয় যে কথা, তিনি তার ধারপাশ দিয়ে যাবেন না, নিজের ডেস্কে বসেই চেঁচাবেন, তা শ্রোতা যে চুলোতেই থাকুন। হয়তো সঙ্গীতা ঘুমোচ্ছে, সেক্ষেত্রে কাছে এসে আস্তে আস্তে ডাকলেই হয়। তা না করে উনি টেবিলে বসে বসেই হাঁক দেবেন, “এই, ওঠো, উঠে পড়ো, চা করো!”

এই চ্যাঁচানোর চোটেই কি ঘুম ভেঙে যাওয়ার শুরু? কে জানে! কাল রাতে সেকথা রোহিতাশ্বকে সে বলেওছিল। তাতে সে বললে, “আরে কাল যখন সন্ধে থেকে ঘুমোচ্ছিলে, রাত হয়ে যাচ্ছে দেখে তোমায় তো খুব আলতো করে প্রেমগদগদ স্বরে ডাকলাম – ওগো, ওঠো, রাত হয়েছে, খেতে চলো! – তা তুমি এমন ধড়মড় করে উঠে বসলে যে আমিই ঘাবড়ে গেলাম।”

“কাল?” ভুরু কুঁচকে গেল সঙ্গীতার। মনে পড়ছে না তো। ‘হবে হয়তো!’ ভাবল সে।

তবে এই বাড়াবাড়িটা শুরু হয়েছে মাস চারেক হল। গত লক ডাউনেও এমনটা হয়নি। এবছরে লক ডাউনে দীর্ঘদিন বাড়িতে আটকে থাকার ফল কি? ভাবার চেষ্টা করল সঙ্গীতা।

রোহিতাশ্ব আজকাল বেশিরভাগ সময় বাড়ি থেকেই কাজ করে, ওয়ার্ক ফ্রম হোম। হপ্তায় একদিন অফিসে যায়। আগে বাড়িতে থাকত কম বাইরে বেশি। এখন প্যানডেমিকে ঠিক উলটো, বাইরে কম, বাড়িতে বেশি।

সঙ্গীতার স্কুলও এখন অনলাইনে। নতুন একটা ল্যাপটপও কিনে নিয়েছে আলাদা করে কাজ করার জন্য। মাস দুই আগে এক বন্ধুর পরামর্শে স্মার্ট প্যাডও কিনেছে একটা। গোড়ায় অসুবিধে হত, অনলাইন ক্লাসে বসে বেশ ঝামেলাই পোয়াতে হত সঙ্গীতাকে অত সড়গড়ো নয় বলে। অথচ, ভাবে সঙ্গীতা, কলকাতায় কম্পিউটার আসার পরপরই বলতে গেলে সেকালে প্রোগ্রামিং-এর ছাত্রী ছিল সে। পাশ করার পর সে আমলে রীতিমতো দু-একটা কোম্পানিতে কম্পিউটার প্রোগ্রামার হিসেবে কাজও করেছে। অল্পদিনের জন্যই, তবুও! সে আমলের সফটওয়ারের নামধাম শুনলেও আজকালকার ছেলেমেয়েরা তা চোখে দেখেনি। এখন বহু বহুগুণ আপডেট হয়ে গিয়েছে অবশ্য। দীর্ঘ অনভ্যাস ও চর্চাহীনতা আজ তাকে এই জায়গায় এনে ফেলেছে। এখন তার কাছে সবকিছুই বিলকুল নতুন। তবে মাসখানেকের ভেতরেই পুরোনো ছন্দটা ফিরে পেয়ে গেল ও। স্মার্টপ্যাড কাজে লাগানোতে ওর মনে হচ্ছিল ও ছেলেমেয়েদের ছুঁয়ে ফেলতে পারছে। যেভাবে বোর্ডে চক দিয়ে লেখার সময় ছাত্রছাত্রীদের নাড়ির গতি অবধি টের পেত ঠিক সেই অনুভূতিটা ফিরে ফিরে আসছিল। টেকনিক্যাল সমস্যা যে হয় না তা নয় সেসব সময়ে ছেলেকে ডেকে নেয় সঙ্গীতা। রোহিতাশ্বর চেয়ে সে অনেক ধীরস্থির আর সহিষ্ণু। রোহিতাশ্বকে ডাকলেই আগে খানিকটা চ্যাঁচাবে, হুড়ুম দুড়ুম করবে। অযথা পাড়া মাথায় করা একেবারে না-পসন্দ সঙ্গীতার। তাই সে সুবাহুকে ডাকে। সে বাপের মতো নয়। শান্তভাবে এসে মাকে বুঝিয়ে দেবে সবটা। এটাই পছন্দ করে সঙ্গীতা।

রোহিতাশ্ব সঙ্গীতার ছেলে সুবাহু। সে গিটার বাজায়। কলেজ সবে শেষ হয়েছে। আজকাল লকডাউনে বাড়িতে বসে বসে ছোটো ছোটো গিটারের টুকরো ইউটিউবে আপলোড করে। সারাদিন বাজনা নিয়েই আছে। চাকরিবাকরি নিয়ে খুব একটা যে মাথাব্যথা আছে তা বোঝা যায় না। আস্তে আস্তে নীচু স্বরে কথা বলে, মায়ের মতো। মোটেই রোহিতাশ্বের মতো গলা তুলে কথা বলে না। তবে আজকাল খুব ফাজিল হয়েছে। সঙ্গীতার চমকে ওঠার সমস্যাটা শুনে বলেছিল, “মা! তোমার ইলেক্ট্রোলাইটিক ইমব্যালান্স হচ্ছে। নুন চিনি খাও বেশি করে।”

সঙ্গীতা চোখ পাকিয়ে তাকিয়েছিল শুধু। খাবার টেবিলে নুন নিতে দেখলেই রোহিতাশ্ব চেঁচায়, “কাঁচা নুন খাবে না।” সঙ্গীতার শাশুড়ি একদিন থাকতে না পেরে ছেলেকে ধমকে উঠে বলেছিলেন, “তর কিরে? সিদ্ধ কুমড়া আলু উইস্ত্যা এইসকলডি নুন ছাড়া খাওন যায়? তুই খা! অরে জুর করিস ক্যা?”

রোহিতাশ্ব তবুও গজগজ করছিল। সঙ্গীতার মজাই লাগে এসব শুনে। ঝগড়া ঠিক নয়। একটা কপট রাগারাগি ঘোরে এবাড়িতে। এখন সেটা মা-ছেলের দিকে শিফট করে গেছে।

তবে গত তিন-চারদিন ধরে যা হচ্ছে তাতে সঙ্গীতার তো বটেই রোহিতাশ্বর অবধি ভুরু কুঁচকে গেছে। ব্যাপারটা আর ঘুম ভাঙা না-ভাঙার মধ্যে আটকে নেই। সামান্য আওয়াজ, বা নাম ধরে আস্তে ডাকলেও চমকে উঠছে সঙ্গীতা।

আজ রবিবার। তো সকালে কী একটা কারণে দরজা খুলে হালকা গলায় ওকে ডাকতেই চমকে উঠল সঙ্গীতা।

“আস্তে ডাকতে পারো না?” গলায় সামান্য ঝাঁজ নিয়েই উত্তর দিয়েছিল। সকালে এই ঘটনার জেরে, দুপুরবেলা রান্নার সময় রোহিতাশ্ব একেবারে ওর কাছে গিয়ে খুবই আস্তে জিজ্ঞেস করেছিল, “চা হবে?”

সঙ্গীতা পেছন ফিরে ছিল। হঠাৎ শুনে চমকে উঠে হাত থেকে খুন্তি ফেলে দিয়েছিল। রোহিতাশ্ব ভয়ানক অপ্রস্তুত হয়ে অপরাধীর মতো মুখ করে দাঁড়িয়েছিল। সে সত্যিই প্রায় ফিসফিস করেই ডেকেছিল। তাতেও যে সঙ্গীতা অমন চমকে যাবে, কে ভেবেছিল! সঙ্গীতা কিছু একটা বলবে ভেবে মুখ খুলেছিল কিন্তু থেমে গেল, বলল না। গত তিনচার দিনে এমন ঘটনা বার সাত আটেক ঘটল। ব্যাপারটা এবারে ভাবিয়ে তুলছে বটে।

আজকাল ভোরে উঠেই ছাতে চলে আসে সঙ্গীতা। ভোরে ওঠা বরাবরের অভ্যেস। ছোটোবেলার স্কুল, তারপর কলেজ সবই সকালে। মাঝে বিশ্ববিদ্যালয়ের বছর দুই বাদ দিলে স্কুলে পড়াতে গিয়ে আবার সেই সকালেই। সাড়ে ছটা থেকে স্কুল শুরু হয় ওর। এসময় স্কুল কলেজ সব বন্ধ থাকার জেরে সকালে বেরোতে হয় না বটে কিন্তু অভ্যেসটা থেকে গেছে, সকালে ওঠার। রোহিতাশ্ব একেবারে উলটো। গভীর রাত অবধি জেগে থাকবে, পড়াশোনা, লেখালেখি, সিনেমা দেখা এসব সেরে ঘুমোতে যাবেন তিনি। আর বেলা করে উঠবেন। উঠেই অফিসে ছোটা। এখন আবার সবদিন সেটা নেইও। এই ক্ষেত্রে ছেলেও বাপের ধারাই পেয়েছে।

ছাতের এককোণে একটা কৌটোয় চাল রাখা থাকে। সঙ্গীতাই রাখে। ফুরিয়ে গেলে ভরে দেয় আবার। তা থেকে ছাতের পাঁচিলের ওপরে ভাগ ভাগ করে চাল দেয়। কাক চড়াই শালিক আর পায়রাদের জন্য। দুটি বাটিতে জল ভরে দেয় রোজ। গরমকালে পাখিদের জল খাওয়ার খুব কষ্ট হয়। বিশেষ করে শহরাঞ্চলে। এই সামান্য জলটুকুও যে ওদের কত উপকারে লাগে! ছাতের একপাশে আট-দশটা ফুলের টব। সেগুলো দেখাশোনা করেন ওর শাশুড়ি অলকানন্দা। তিনি মাঝেমধ্যেই অনুযোগ করেন ছেলের বউয়ের কাছে, “বউমা, তোমার পোষ্যরা আমার তুলসিচারার পাতা খাইয়া নিতাছে!”

সঙ্গীতা হেসে বলেছে, “খাক না মা! একটু মুখ বদলাতে চেয়েছে না হয়। ও আবার গজিয়ে যাবে।”

পাখি, গাছ, ঠান্ডা হাওয়া, ভোরের আলো এই সব মিলিয়ে ভোরের বেলাটা দারুণ কাটে সঙ্গীতার। আর ভালো কাটে যখন গান করতে বসে। সেই কবে ছোটোবেলায় মা নিয়ে গিয়েছিল সুরঙ্গমাদির কাছে। গান শিখতে। বড়ো স্কুলবাড়ি। রোববার সকালে সেটা গমগম করত তানপুরা, হারমনিয়াম, তবলার আওয়াজে। নানান ঘর থেকে গানের সুর ভেসে আসত। কী যে ভালো লাগত। ওটা তখনকার দিনে দক্ষিণ কলকাতার বেশ বড়ো গানের স্কুল ছিল। সুরঙ্গমাদির বয়েস এখন পঁচাত্তর। সঙ্গীতা আজও হাত ছাড়েনি ওঁর। স্কুলটা নেই। তবে গান আছে। ছাত্রছাত্রীরা আসে। গান শেখে। জীবনের প্রায় সবটাই রবীন্দ্রনাথের গানে গানে ভরে রয়েছে ওঁর।

আজ ছাতে উঠে মনে হল সুরোদিকে সেই গানটার কথা বলবে। অনেকদিন আগে শিখিয়েছিলেন। ভুলে গেছে সঙ্গীতা। ফের একবার ঝালিয়ে নেবে। লকডাউনে নিরুপায় হয়ে সুরঙ্গমাদিও মোবাইল ফোন চালিয়ে অনলাইনেই গান শেখাচ্ছেন। অনলাইনে ঠিক জমে না। দুধের স্বাদ কি ঘোলে মেটে! অগত্যা উপায়ই বা কই! গান শিখতে বসলে অবশ্য আর কিছু খেয়াল থাকে না। সুরের মধ্যে বিভোর হয়ে থাকে সঙ্গীতা। গানটার খানিক মনে পড়তেই চটপট নীচে চলে এল ও। লিখে রাখতে হবে। সন্ধেয় বলবে সুরোদিকে। শোবার ঘরে ঢুকে সঙ্গীতা দেখল রোহিতাশ্ব উপুড় হয়ে ঘুমোচ্ছে। ডান হাতে তর্জনীর ডগায় আর মধ্যমার ভেতরের দিকে কালির দাগ। কাল রাতে কালি পেনে লিখছিল বোধহয়। নিজের মনেই একটু হেসে বইয়ের তাকের দিকে এগিয়ে গেল ও। খুঁজে খুঁজে স্বরলিপিটা বার করে। স্বরবিতান ৪৫। পঁয়তাল্লিশ নম্বর পৃষ্ঠা। মাত্র চারটে লাইন লেখা –

দাও হে হৃদয় ভরে দাও।

তরঙ্গ উঠে উথলিয়া সুধাসাগরে,

সুধারসে মাতোয়ারা করে দাও।।

যেই সুধারসপানে ত্রিভুবন মাতে তাহা মোরে দাও।।

তেইশ বছর বয়েসী এক যুবক জোড়াসাঁকোর বাড়িতে বসে পিলসুজের আলোয় লিখছেন এই গান। ভেবে, গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল সঙ্গীতার। সে বই কোলে করে থম মেরে বসে রইল।

সকাল থেকে হুড়োহুড়ি গেল খুব। কাজের মেয়েটাকে লকডাউনে ছুটি দিয়ে দেওয়া আছে। নইলে বেচারার অত দূর থেকে আসতে হলে খুবই মুশকিলে পড়ত। গাড়ি ঘোড়া পাওয়া এক সমস্যা তার ওপর রাস্তায় পুলিশের সাত সতেরো প্রশ্ন। তার চে বাড়ি বসে থাক, বলেছিল সঙ্গীতা। আমি মাসে মাসে তোর বরের মোবাইলে টাকা পাঠিয়ে দেবখ’ন। ওর বর ছেলেটা ভালো, রঙের মিস্তিরি। এখন হাতে কাজকর্ম বিশেষ নেই।

আজ রোহিতাশ্বকে অফিসে যেতে হবে বলে, সকাল সকাল বেরোতে হবে। সেকথা ও জানায়নি আগে থেকে। ফলে সকালে উঠে রান্নার ব্যবস্থা করতে নাভিশ্বাস উঠে গেছে সঙ্গীতার। দুপুরে খেয়ে দেয়ে গড়িয়ে নেবার পর সন্ধের মুখে কী মনে করে একবার ছাতে গেল ও। আলসে জুড়ে সার সার পায়রা। বিকেলে চাল-জল দেবার থাকে না খুব একটা। পায়রারাও পাঁচিল থেকে ছাতের মেঝেয় বড়ো একটা নামে না। ওপরেই বসে থাকে। আজ সঙ্গীতা ওই মেঝেতেই অনেকটা এলাকায় চাল ছড়িয়ে দিতেই সক্কলে ফুরফুর করে নেমে এল সেখানে। ওদের দিকে একদৃষ্টিতে দেখছিল সঙ্গীতা। একেকজন একেকরকম। কেউ রাশভারী, কেউ ফিচেল, কেউ ঝগরুটে, কেউ শান্ত চুপচাপ। কেউ আবার চুপটি করে এককোণে দাঁড়ানো। কেউ বা পাঁচিল থেকেই নামেনি। ওখানে বসেই নীচের ভিড়ের রগড় দেখছে। দেখতে দেখতেই সঙ্গীতার নজর পড়ল একটা গাঢ় ধূসর মেয়ে-পায়রার দিকে। একটু তফাতে চাল খুঁটে খুঁটে ঠোঁটে তুলছিল সে। তুলে চোখ বুঁজে গিলছে ফের খুঁটে খুঁটে ঠোঁটে তুলছে।

পায়রাটাকে কেমন চেনা চেনা ঠেকছিল সঙ্গীতার। ও ভাবছিল ওদের ভেতরেও কি অলকানন্দা, রোহিতাশ্ব, সঙ্গীতা, সুবাহু – এরা আছে? ভাবনাটা মনে আসতেই হাসি পেল। আর ঠিক তখুনি একটা লাল-চোখো পায়রা আগের পায়রাটার পেছনে এসে একটা অস্ফুটে ‘গুরর’ শব্দ করতেই প্রথম পায়রাটা অবিকল সঙ্গীতার মতো চমকে গিয়ে ডানা ঝটপটিয়ে উঠল। সেটা লক্ষ করে সঙ্গীতার বুকটা ধড়াস করে উঠল। দিনের আলো প্রায় মরে এসেছিল; সঙ্গীতা নিজের বাহুতে হাত দিয়ে যেন নরম পালকের স্পর্শ পেল! তবে কি ও-ও ধীরে ধীরে এবারে পায়রা হয়ে যাচ্ছে?

অলঙ্করণ-অর্ণব চক্রবর্তী

   

গল্প-উপন্যাসের লাইব্রেরি এইখানে

Leave a Reply