ঋতা বসুর আরো গল্প: শিকার ও শিকারী, মিষ্টিবুড়ির কাণ্ড, ঘুমপাড়ানি মাসিপিসি, মৌটুসীর বাসা, বিজু যা দেখে, আলো ছায়ার খেলা , সুশোভন বাগচির এক্সপেরিমেন্ট, ডাইনীর প্রতিশোধ,সোনা আর কোলা

পাখির শূন্য খাঁচাগুলোর দিকে তাকিয়ে বসে থাকতেই ভালো লাগে মহীতোষের। চোখে ইদানীং একেবারেই ঝাপসা দেখছে সে। ডাক্তারবাবু বলেছেন দু-চোখেই ছানি শক্ত হয়ে যাচ্ছে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব অপরেশন করিয়ে নিতে। সমস্যার কথা ভাবতে আর ভালো লাগে না। চোখে ভালো দেখে না বলেই মনের মধ্যে ছোটোবেলার দিনগুলো উজ্জ্বল। কীসব দিন ছিল! এই উঠোনটা একদিন দেশ-বিদেশের পাখিতে ভরে থাকত। সূর্যের আলো এসে পড়ত খাঁচার ভেতর নানা রঙের পাখির গায়ে। মনে হত যেন রামধনু নেমে এসেছে আকাশ থেকে।
মহীতোষ খুব ছোটোবেলায় সেই দৃশ্য দেখেছে। বাবার কাছে গল্প শুনেছে বেশি। ঠাকুরদা করিতকর্মা পুরুষ ছিলেন। শূন্য হাতে এই শহরে এসে কলের জল আর মুড়ি খেয়ে শুধু পরিশ্রম, সততা, নিষ্ঠার জোরে সেই আমলে নিজের দোকান করেছিলেন। সাহেবদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এমন সুনামের সঙ্গে কাজ করেছেন যে কলকাতা ছাড়িয়ে ভারতবর্ষের অন্যান্য শহর থেকেও তাঁর কাছে খদ্দের আসত। বাবাও দেখেছে সেই সুসময়ের খানিকটা।
কিন্তু গোড়াটা ছিল একেবারে অন্যরকম। ঠাকুরদার জীবনের গল্পটার কাছে অন্য রূপকথাগুলো দাঁড়াতেই পারে না। গ্রামের বাড়িতে ডাংগুলি খেলে, পুকুরে দাপাদাপি করে দিন কাটছিল ঠাকুরদা শিবতোষের। স্বাধীনতার আগে সেই এঁদো গ্রামে না ছিল ইলেকট্রিক, না ছিল কোনও স্কুল-পাঠশালা। কোনও উপায় না দেখে গ্রামের কয়েকজন লোক কাজের খোঁজে চলে এসেছিল কলকাতায়। তাদেরই একজন শিবতোষকে নিয়ে আসে। কলকাতায় যে-বাড়িতে সে বাগান, গোরু ইত্যাদি দেখাশোনা করত, সেখানেই পেছন দিকে একসারি ঘরে ঠাকুর, চাকর, মালি, ধোপা, নাপিতের বাস। বড়ো বাড়ির ব্যাপার-স্যাপার দেখে শিবতোষ হাঁ।
সেই লোকটি ওকে এই বলেই এনেছিল, ‘শহরে হাজার কিসিমের কাজ। টাকা উড়ছে হাওয়ায়। ধরতে জানলে আর ভাবনা নেই। যতদিন না কাজকর্ম কিছু জোটে, থাক এখানে। বাবুর নেকনজরে পড়ে গেলে তোর একটা হিল্লে হয়ে যেতেও পারে।’
কপালজোরে শিবতোষ পড়েও গেল বাবুর নেকনজরে। এই বাবু কিন্তু শহুরে অন্য বাবুদের থেকে আলাদা ছিলেন। অন্য বাবুরা যখন নাচগান, বুলবুলির লড়াইয়ে হাজার হাজার টাকা খরচ করছেন, ইনি তখন সাহেবদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে নিজের ব্যাবসাটাকে বড়ো করে তুলছেন। একদিন শিবতোষকে গোয়াল পরিষ্কার করতে দেখে জিজ্ঞেস করলেন, “ছেলেটা কে? আগে দেখিনি তো।”
“রামলোচনের গ্রাম থেকে এসেছে।” সরকারবাবু বললেন।
“দেখে বেশ চটপটে মনে হয়। আজ থেকে ও আমার সঙ্গে বাজারে যাবে।”
ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আসতে তখনও পনেরো বছর বাকি। আজকের নিউ মার্কেটের নাম তখন হগ সাহেবের বাজার। কী না পাওয়া যায় সেখানে? পয়সা দিলে নাকি বাঘের দুধও মেলে। এমন সুন্দর নকশা সেই বাজারের যা এ-দেশের লোক কোনোদিন দেখেনি। প্রতিটা দোকান, বাজারের ভেতরের রাস্তা এত চমৎকার করে সাজানো যে ঢুকলে পরে বেরোতে ইচ্ছে করে না। কলকাতার তখন সবথেকে বড়ো আকর্ষণ হগ সাহেবের বাজার। সেই জন্য এখানে যারা দোকানের মালিক, তাদেরও খুব দেমাক।
প্রথমদিন সেই বাজারে ঢুকে ঠাকুরদা শিবতোষের কী হাল হয়েছিল সে-গল্প মহীতোষ অনেকবার শুনেছে। বাবু বললেন, “আজ ভালো করে দেখেশুনে রাখ। কাল থেকে এই দোকানের সামনে থেকে শুরু করে ওই পর্যন্ত ঝাড়ু-পোঁছা করা, পাখির খাঁচা পরিষ্কার করা তোর কাজ। ভালো করে কাজ শিখে নে। পরে পাখিদের দেখভাল করবি।”
পাখির খাঁচা দেখে শিবতোষের চক্ষু চড়কগাছ। এতরকমের পাখি যে আছে এই দুনিয়ায় তা-ই তো সে জানত না। আস্তে আস্তে কত কিছু শিখল। পাখিদের নাম, তারা কোথা থেকে এসেছে, কী খায়— সব জেনে গেল ক’দিনের মধ্যে। তার সঙ্গে কানে শুনে শুনে ইংরেজি ভাষাটাও খানিকটা রপ্ত করে ফেলল। বাবুর চোখ ভুল দেখেনি। শিবতোষের ভেতরে যে আগুন ছিল উনি শুধু সেটাকে উসকে দিয়েছিলেন।
ধীরে ধীরে শুধু পাখি নয়, পুরো দোকানের ভারই শিবতোষের ওপর এসে পড়ল। সকালে এসেই সে পাখিগুলোকে ভালো করে খুঁটিয়ে দেখে নেয়। কার শরীর খারাপ হল, কে খাচ্ছে না, কার গরম সহ্য হচ্ছে না, কার পেট খারাপ, কার ঠান্ডা লাগল— মানুষের থেকেও বেশি যত্ন দরকার এই একরত্তি খুদেগুলোর। অজ পাড়াগাঁয়ের ছেলে হলে কী হবে, তার প্রখর বুদ্ধি ছিল। খুব অল্পদিনের মধ্যেই জলের মতো বুঝে নিল কে কী খেলে ভালো থাকে। কারও খাবারে পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট লাগে, কেউ খায় ছাতু, কারও আবার পিঁপড়ের ডিম হলে ভালো। পাখিগুলোর ডানা, চোখের চাউনি লক্ষ করে সে নিমেষে বুঝে যেত এর এখন তাগতদার খাবার দরকার। ছাতুর সঙ্গে তখন মেখে দিত মুরগির ডিম। পোকামাকড় খাওয়া পাখি যেমন আছে, তেমনি আছে ভালো মাংসের কিমা ছাড়া মুখে না তোলা পাখিও।
শিবতোষ এমনভাবে প্রতিটা খুঁটিনাটি কাজ শিখে নিয়েছিল যে বাবু নিশ্চিন্ত হয়ে তার ওপরেই দোকানের ভার ছেড়ে দিয়েছিলেন। ক্রমশ সেই বাচ্চা ছেলে যুবক হল, বাবুও বৃদ্ধ হলেন। তাঁর ছেলের ব্যাবসার দিকে কোনও মনোযোগ ছিল না। বাবু বুঝেছিলেন, এই ছেলের হাতে দোকান লাটে উঠবে। বাবু একদিন শিবতোষকে ডেকে বললেন, “আমার যা সম্পত্তি সবই আমার ছেলে পাবে। কিন্তু পাখির দোকানটা আমি তোমাকে লিখে দিতে চাই। একটাই শর্ত, দোকানের মালিকানা বদলালেও নাম বদলানো চলবে না।”
এই জায়গায় বাবা একটু থেমে খুব গর্বের সঙ্গে বলতেন, “তারপর থেকে হগ মার্কেটের ওরিয়েন্টাল বার্ড স্টোর্সের মালিক আমরাই। বাবা দোকানটা আরও বড়ো করেছিলেন। সেই সময় ওই বাজারে আরও পাখির দোকান ছিল। পাখির তখন খুব চাহিদা। বাবা একা পেরে উঠত না বলে আমাকেও কত সাহেব বাড়ি, কলকাতার কত বনেদি বাড়িতে গিয়ে পাখির জোগান দিতে হত। পাখিগুলোর ঠিকমতো আদর যত্ন হচ্ছে কি না দেখার জন্যও যেতে হত।”
বাবা কোনোদিন নিউ মার্কেট বলেননি। বলতেন, হগ মার্কেট। সেই আমলের মার্কেট সত্যি এক বিচিত্র ব্যাপার। মহীতোষ তার কিছুই দেখেনি। সে যখন বড়ো হচ্ছে তখন তাদের একেবারে পড়তি অবস্থা। সেই জন্যই বোধ হয় সেই জমজমাট দিনগুলোকেই সে বুকের মধ্যে পাখির ছানার মতো করেই পুষে রেখেছে। মহীতোষ আবদার করত, ‘বাবা, সেই নিলামের গল্প বলো।’
বাবা দেবতোষ সেই শুনে শুনে পুরোনো না হওয়া গল্প আবার বলতেন।— “যে দোকানে যত দুর্লভ পাখি থাকত, তার নাম ছড়িয়ে পড়ত। বাবা পাখি বিক্রির সঙ্গে সঙ্গে শৌখিন লোকেদের বাড়ির পাখি দেখভালের ভারও নিয়েছিলেন। এতে বেশ মোটা টাকা রোজগার হত।
“এই কাজটা আমিই বেশি করতাম। একবার দোকানে লালঝুঁটি আমাজন প্যারট এল। লাহাবাবুদের সঙ্গে তখন মল্লিকবাবুদের খুব রেষারেষি। আমি লাহাবাবুর পাখিদের দেখাশোনা করি। আমার থেকে খবর পেয়ে লাহাবাবু দোকানে এলেন পাখি দেখতে। ঠিক সে-সময় মল্লিকবাবুও হাজির। ব্যস, দুজনের মধ্যে লেগে গেল লড়াই। পাঁচশো টাকার পাখির দাম উঠে গেল সাত হাজার। ভাবতে পারিস সেই আমলে সাত হাজার টাকা আজকের কয়েক লক্ষ। সাত হাজারে তখন একটা দামি গাড়ি হয়ে যায়। ঠাকুর-চাকর সমেত একটা সংসারের মাসের খরচ বা এত্ত সোনা কেনা যায়। সেখানে ওই একরত্তি পাখির জন্য অত দাম উঠল।”
“কে নিলামে জিতল?”
“কেউ না। দত্তবাবুরা তখন উঠতি বড়োলোক। নিলাম থেমে গিয়েছিল পাঁচ হাজারে। দত্তদের নায়েব সেটা একেবারে সাতে নিয়ে গেল। পাখি নিয়ে যাবার সময় দত্তবাবুর মুখটা যদি একবার দেখতিস। দুই বাবুকে পাখির লড়াইয়ে হারিয়ে মনে হচ্ছিল সমস্ত কলকাতাটিই যেন জয় করেছেন। মাঝখান থেকে আমরা ভাড়াবাড়ি থেকে নিজেদের এই দোতলা বাড়িতে উঠে এলাম। স্রেফ একটা পাখি বেচা টাকায়।”
গল্প বলতে বলতে দেবতোষ অন্যমনস্ক হয়ে পড়েন। মহীতোষ তাড়া লাগায়, “তারপর কী হল বলো।”
“কিন্তু এই সুখের দিন আর রইল না। হগ মার্কেটে পাখি ছাড়াও অন্য জন্তুজানোয়ার বিক্রি হত। বাঘ, হনুমান, হরিণ, নানা জাতের সাপ এমনকি হাতিও বিক্রি হত। একবার খাঁচা ভেঙে একটা বাঘ বেরিয়ে পড়েছিল। সবাই মিলে বাঘটাকে পিটিয়ে মেরে ফেলল। খুব ক্ষতি হয়েছিল ভিনসেন্ট সাহেবের। চামড়াটা বিক্রি করে অবশ্য খানিকটা সামাল দেওয়া গিয়েছিল। স্বাধীনতার দশ বছর বাদে সরকার বিদেশ থেকে পাখি, জন্তুজানোয়ার আমদানি বন্ধ করে দিল। পাখির বাজারের জৌলুস একেবারে ফিকে হয়ে গেল। বাবা বেশ কিছু পাখি যেমন ম্যাকাও, বারাবাগু প্যারাকিট, সিনিগল প্যারট, রোজেলা প্যারাকিট, ধূসর তোতা— আরও অনেকরকম পাখি যেগুলো দোকান আলো করে থাকত, সব বাড়ি নিয়ে এলেন। খুব বুদ্ধিমান ছিলেন তো, আমাকে বললেন, ‘আমদানি বন্ধ হয়ে গেলে এই পাখির ব্যাবসা খোঁড়া। খুঁড়িয়ে হাঁটার থেকে তুমি একটা নতুন ব্যাবসার কথা চিন্তা করো।’
“আমার তখন পাখির নেশা। নতুন ব্যাবসা করার ইচ্ছেও নেই, শেখার দমও নেই। বাবা অনেক ভেবেচিন্তে কম পরিশ্রমে যাতে দোকানটা চালাতে পারি সেই জন্য উল তার সঙ্গে লেস, সুতো, কুরুশ, কাঁটা, মেয়েদের সেলাইয়ের সব সরঞ্জাম রাখতে শুরু করলেন। বিদেশ থেকে নকশার বই আসত। বাঙালি অবাঙালি অ্যাংলো মেয়েরা দল বেঁধে দোকানে আসত। পাখির মতো না হলেও ভালোই চলছিল। রঙবেরঙের পাখির বদলে নানা রঙের সুতো, উল। তার সঙ্গে নানা বয়সের, নানা জাতের মানুষে দোকানটা ভরে থাকত।”
তারপরেই মহীতোষ টের পেত, বাবার গলাটা বিষণ্ণ হয়ে আসছে। এই সময়টা অবশ্য তারও বড়ো হয়ে ওঠার সময়। সেই জন্য তাদের ব্যাবসা যে ভালো চলছে না সেটা মা-বাবার কথা থেকেই টের পেত। ঠাকুরদা তখন বিছানাতেই বেশিরভাগ সময়। কিন্তু তেজ কমেনি। শুয়ে-শুয়েই বাবাকে নানা পরামর্শ দিতেন। বলতেন, “গোপালবাবুর সঙ্গে দেখা করো। ওঁদের পোশাকের দোকান। যদি এম্ব্রয়ডারি করা জিনিস সাপ্লাই করতে পারো।”
বাবা চুপ করে শুনে ঘরে চলে আসতেন।
মা বলতেন, “উনি যা বলছেন করে দেখবে নাকি?”
বাবা বলতেন, “উনি যা পারেন তা কি আমি পারি? এখন সময়টাই বদলে গিয়েছে। মেয়েরা ছেলেদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কাজে বেরোচ্ছে। ছুঁচ-সুতো, উল কাঁটা নিয়ে বসে থাকার সময় কোথায় তাদের? তাছাড়া সোয়েটার বোনার মেশিন বেরিয়ে গিয়েছে। কয়েক ঘণ্টায় নকশাদার সোয়েটার বোনা হয়ে যায়। হাতে বোনা উঠেই গেল প্রায়। বাবা বুঝছেন না আমার অবস্থা ঢাল তরোয়াল ছাড়া নিধিরাম সর্দারের মতো।”
ঠাকুরদা যতদিন বেঁচে ছিলেন বাবা কোনোরকমে দোকানটা চালালেও মারা যাবার সঙ্গে-সঙ্গেই দোকানটা ভাড়া দিতে বাধ্য হলেন। এখন মা-বাবা দুজনেই গত হয়েছেন। নামমাত্র ভাড়ার টাকায় খাওয়া-পরাটা কোনোরকমে হলেও চিকিৎসার টাকা অসম্ভব। সেই জন্য মহীতোষ বসে বসে কল্পনায় সেই জমজমাট রঙিন দিনের ছবি দেখেই সময় কাটিয়ে দেয়।
কিন্তু আজ হঠাৎ তাতে বাধা পড়ল। উঠোনের দরজা ঠেলে দুটো ঝাপসা মানুষ ক্রমশ তার কাছে এগিয়ে এল। একদম কাছে আসার পর মহীতোষ একজনকে চিনতে পারল। বিজয়প্রসাদ, যে এখন ওরিয়েন্টাল বার্ড স্টোরের মালিক। দোকানের নাম বদলে ওরিয়েন্টাল ক্রাফট হয়েছিল বাবা থাকতেই। এখন দামি বিয়ের পোশাক বিক্রি হয়। খোলনলচে আমূল বদলে গিয়েছে। চেহারার মতো নামও একেবারে পালটে হয়ে গিয়েছে গোল্ডেন স্টার।
বিজয়প্রসাদের সঙ্গের মানুষটার একটু বয়স হলেও বেশ শক্তপোক্ত। মুখে হাসি নিয়ে এগিয়ে এলেও মহীতোষের মনে হল এই মানুষটির অনেক ক্ষমতা, এঁকে সহজে উপেক্ষা করা যায় না।
মহীতোষ হাতজোড় করে বিজয়প্রসাদকে নমস্কার জানিয়ে বলল, “আপনি একেবারে বাড়িতে চলে এলেন! কিছু ঘটেছে নাকি? আশা করি সব খবর শুভ। এঁকে চিনলাম না?”
“এলাম আপনার সঙ্গে এঁর আলাপ করিয়ে দেবার জন্য।”
মহীতোষ অবাক হয়ে তাকাতে সঙ্গের ভদ্রলোক বললেন, “আমার নাম শাকিল আলম। আমাকে চিনতেন আপনার বাবা। আর আপনার ঠাকুরদার দৌলতেই আমি আজ এই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছি। বিজয়কে আমিই নিয়ে গিয়েছিলাম আপনার বাবার কাছে। ওর কাছেই আপনাদের খবর পেতাম। তারপর অনেকদিন হল নিউ মার্কেটের ব্যাবসাটা আমি ছেলেদের হাতে ছেড়ে দিয়ে পাহাড়েই থাকি। অনেকদিন পর কলকাতায় এসে বিজয়ের কাছে আপনার খবর পেয়ে দেখা করতে এলাম।”
“হঠাৎ আমার কাছে কেন?”
“সেটা পরে বলছি। তার আগে একটা গল্প শুনুন। অনেকটা আপনার ঠাকুরদার জীবনের মতোই। সেই ছেলেটাও গ্রাম থেকে এসে হগ সাহেবের বাজারে একটা ফুলের দোকানে ফাইফরমাশ খাটার কাজে লেগেছিল। কাজের ফাঁকে ফাঁকে ফুলের দোকান থেকে ঝেঁটিয়ে ফেলে দেওয়া ফুল থেকে টাটকা ফুল বেছে তোড়া বেঁধে রাস্তায় রাস্তায় বিক্রি করত। এমনি করে কিছু পয়সা জমিয়ে সে নিজেই ফুল কিনে বাজারের রাস্তার পাশে বসে বিক্রি করা শুরু করল। তার স্বপ্ন ছিল একটি নিজস্ব দোকানের। ছেলেটি নিজে খুব খাটলেও তার সেই স্বপ্ন কখনোই সফল হত না যদি না আপনার ঠাকুরদা শিবতোষ প্রামাণিক সাহায্য করতেন। ওই ছেলেটার মধ্যে তিনি নিজের লড়াই দেখতে পেয়েছিলেন। আমিই সেই ছেলেটা। দিনের সঙ্গে আমার ব্যাবসা আরও বড়ো হল। সরকারি নিষেধাজ্ঞার ফলে পাখির ব্যাবসায় মন্দা দেখা দিল। কিন্তু ফুলের বাজার দিনে দিনে ফুলে-ফেঁপে উঠল। মামুলি কয়েক জাতের ফুল দিয়ে শুরু করেছিলাম। এখন নানারকম অর্কিড বিদেশে এক্সপোর্ট করি। সেই জন্য কালিম্পংয়েই থাকি। নাতির বিয়েতে কলকাতায় এলাম বহুবছর পর।”
মহীতোষ মুগ্ধ হয়ে শুনছিল আলম সাহেবের কথা। বাবার কাছে শুনেছে, ঠাকুরদা কত লোককে যে সাহায্য করতেন তার ঠিক নেই। আজ চোখের সামনে একজনকে দেখে তার খুব ভালো লাগল। আলম সাহেব এবারে কাছে এসে দু-হাত দিয়ে মহীতোষের হাত দুটি ধরে বললেন, “আপনার চোখের ব্যাপারটা বিজয়ের কাছে শুনে আর থাকতে পারলাম না। আমার জানা ভালো ডাক্তার আছে। অপরেশন করিয়ে নিন। সব দায়িত্ব আমার। শিবতোষবাবুর জন্য কিছু করতে পারিনি। তাঁর বংশধরের জন্য দয়া করে এইটুকু করার সুযোগ দিন আমায়।”
মহীতোষের চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে চারদিক আরও ঝাপসা হয়ে গেল। কিন্তু তার মধ্যেও সে চারপাশে রাশি রাশি রঙিন পাখি আর ফুল দেখতে পেল।
ছবি তন্ময় বিশ্বাস





