আগের পর্ব- বন্ধু বানরদল, ট্রেন চড়ল জাহাজে, জুনপুটের সন্তোষ মাঝি, নীলনদের ফেরিওয়ালা, তাঁবুতে রাত্রিবাস, পুরনো ডাকাতদলের আস্তানায়, ভেলায় চড়ে ভারত মহাসাগর, আফ্রিকার সেৎসি মাছি ও বুলগেরিয়ার গোলাপ, লঙ্কাদেশের অশোকবনে,ঠাম্মু-দিদুর গল্প বলা
রাত্তিরেতে বেজায় রোদ

কেউ যদি বলে সে এমন এক দেশে গিয়েছিল যেখানে ‘রাত্তিরেতে বেজায় কে রোদ তাহলে তাকে। কি মিথ্যুক বলবে? কিংবা গুলবাজ? নাকি ভাববে ছেলেটা নিশ্চয়ই সৌরীন্দ্রমোহন মুখোপাধ্যায়ের ‘চালিয়াৎ চন্দর’ গল্পের সেই চালিয়াৎ?
তাহলে কিন্তু খুব ভুল হবে। সুকুমার রায়ের ছড়ায় রাত্তিরে বেজায় রোদের কথাটা আছে বলেই শুধু নয়,আমাদের এই পৃথিবীতে সত্যিসত্যিই এমন দেশ আছে যেখানে রাত্তিরেতে বেজায় রোদ!তোমাদের মধ্যে কেউ কেউ হয়তো সে-দেশে গিয়েছ।
কয়েক বছর আগে আমিও গিয়েছিলাম। সে-দেশে রাত বারোটায় আকাশে ঠিক দুপুর বারোটার সূর্য!

দেশটার একেবারে উত্তরে সুমেরু মহাসাগরের কূলে নর্থ কেপ-এ দাঁড়িয়ে সেবার মাঝরাতে মধ্যাহ্নের আগুনজ্বলা আকাশের অনেক ছবি তুলেছি।
দেশটার নাম এতক্ষণে নিশ্চয়ই মনে পড়েছে তোমাদের? নরওয়ে। বড়োরা তাদের ভাষায় বলে- নিশীথ সূর্যের দেশ। সেখানে গ্রীষ্মকালে প্রায় সারারাতই সূর্যের আলো।
আবার, শীতকালে আকাশ জুড়ে অদ্ভুত সব রঙিন আলোর নাচন দেখতে দূর দূর দেশের মানুষ এদেশে চলে আসে। তখনও জানতাম না, শুধু আকাশের আলোকচ্ছটাই নয়, মাটির লোক-কাহিনিও এদেশে কিছু কম নয়।
দেশের রাজধানী ওসলো-শহর থেকে অল্প দূরে একটা গ্রামে আমার এক বন্ধু আছেন। কথা আছে, আমি নর্থ কেপ থেকে নেমে পৃথিবীর সবচেয়ে উত্তরের শহর হ্যামারফেস্ট আসব , সেখান থেকে জাহাজে সুমেরু মহাসাগরে ভেসে পড়ব। পাঁচদিনের সেই সমুদ্রযাত্রার পর নরওয়ের মধ্যযুগের রাজধানী বার্জেন এসে পৌঁছব সেখবর আগেই আমার নরওয়ের সেই বন্ধুকে জানিয়েছিলাম। এও বলা ছিল বার্জেন থেকে ট্রেনে ওসলো যাব। ওসলো নরওয়ে দেশটার এখনকার রাজধানী।
ওসলোয় ট্রেন থেকে নেমেই দেখি আমার বন্ধু সপরিবারে আমার জন্য অপেক্ষা করছেন। বন্ধু নিজেই গাড়ি চালিয়ে আমাকে আমার হোটেলে পৌঁছে দিলেন। পরদিন হোটেল থেকে তুলে তাঁদের বাড়ির বাগানে বসে ব্রেকফাস্ট খাইয়ে, সারা শহর ঘুরিয়ে দেখিয়ে বিকেলে বিমানবন্দরের পথে একটা অদ্ভুত জায়গায় নিয়ে এলেন। জায়গাটা পুরনো দিনের বিরাট একটা গ্রামের মতো। ভেতরে ঢুকে দেখি, সেখানে নরওয়ের বহুকাল আগের সব ঘরবাড়ি। যেন দূর দূর থেকে অবিকল তুলে এনে বসিয়েছে। আগেকার যুগের ঘরবাড়ি, তখনকার মানুষজনের ঘর-সংসার ঠিক কেমন ছিল খানিকক্ষণ ঘুরলেই তুমি নিজের চোখে দেখতে পাবে।
এক জায়গায় আবার একটা বাঁধানো মণ্ডপ, সেদিন সেখানে আমার জন্যই নরওয়ের লোকনৃত্য দেখানোর ব্যবস্থা হয়েছে। আমি যখন যে দেশেই যাই সেখানকার লোকশিল্প, লোকসংগীত, লোক-কাহিনী দেখতে শুনতে জানতে ভালোবাসি জেনে আমার বন্ধু এই লোকসংস্কৃতির গ্রামে আমাকে নিয়ে এসেছেন।
বিমানবন্দরে পৌঁছবার সময় হয়ে যাচ্ছে। দেশটা ছেড়ে চলে যাবার আগে যত পারি দেখে নেব বলে দুপুরে খাওয়ার নেমন্তন্নে বেশ কয়েকবার ‘না’ বলেছি। শেষপর্যন্ত এই লোকসংস্কৃতির গ্রামেই একটা ক্যান্টিনে স্যান্ডউইচ আর কফি দিয়ে আমাকে বসিয়ে রেখে বন্ধু বললেন, ‘তোমাকে এয়ারপোর্টে নামিয়ে আমার এক বন্ধুর মেয়ের জন্মদিনের নেমন্তন্নে যেতে হবে, পরে আর সময় পাব না, একটু বসো, আমি এখান থেকেই জন্মদিনের একটা উপহার কিনে নিয়ে আসছি।’
বিমানবন্দরে পৌঁছে দিয়ে, বিদায় নেবার সময় আমার বন্ধু কিছুক্ষণ আমার হাত ধরে দাঁড়িয়ে রইলেন। তারপর একটু আগের কেনা প্যাকেটটা হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন, ‘এটা তোমার জন্য।’
প্লেনে উঠে প্যাকেট খুলে দেখি একটা বই, নাম ‘নরওয়েইজিয়ান ফোকটেলস।’ নরওয়ের লোককাহিনী বা উপকথার এক রত্নভাণ্ডার।
বন্ধুর মেয়ের জন্মদিন তবে মিথ্যে! ওই বাহানায় আসলে আমার পছন্দের বই কিনতেই গিয়েছিলেন!
উঠোনে বনের বাঘ

এখন যারা ছোটো, তারা কি কখনও ফড়িং ধরেছ? ছোটবেলায় আমি ধরেছি। এ ফড়িং এদিক ওদিক একটুক্ষণ ওড়ে, তার পর হঠাৎ একটা উঁচু ঘাসের ডগায় এসে বসে। একটুও নড়ে না। তখন পা টিপে টিপে এগিয়ে, অনেকটা ঝুঁকে খপ করে ফড়িংয়ের ল্যাজটা দু’আঙুলে চেপে ধরতাম। তাতে যে ফড়িংয়ের ব্যথা লাগে সেটা তখন বুঝিনি। বুঝলে কি আর ফড়িং ধরি।
এখনও, এই বড় বয়েসেও, ছেলেবেলায় সারা মাঠ ঘুরে বেড়ানোর আনন্দের কথা মনে পড়লে তার সঙ্গে ধরা পড়া ফড়িংয়ের কষ্ট মিশে থাকে।
কয়েক বছর আগে এক দেশে দেখলাম লামারা অনেকগুলো বাঘকে খোলা আকাশের নীচে আশ্রমের মতো একটা জায়গা বানিয়ে লালন-পালন করছেন। সেখানকার একজন লামা অর্থাৎ বৌদ্ধ সন্ন্যাসীর কাছে শুনলাম আমাদের জিম করবেট ন্যাশনাল পার্কের একটা আহত বাঘকে এখানে এনে এঁরা তাকে সুস্থ করে তুলেছেন। লামাদের কাছেই শুনলাম, ভারতের এরকম আহত বাঘ আর নিহত বাঘের অনাথ বাচ্চাদের নিয়ে এই আশ্রম চালাচ্ছেন এঁরা। সব বাঘেরই গলায় শেকল বাঁধা। শুয়ে শুয়ে যেন ঝিমোচ্ছে। আমি নীচু হয়ে বসে কয়েকটা বাঘের গায়ে মাথায় বেশ কিছুক্ষণ হাত বুলিয়ে দিয়েছি। সত্যিই যদি আহত বা অনাথ বাঘকে ওষুধ-পথ্য দিয়ে, স্নেহে-যত্নে সেবা-শুশ্রূযায় লালন-পালন করা হয় তাহলে সেটা তো পশুপ্রেমের একটা ভালো নজির। তার মধ্যেও কিন্তু একটা খুব বড় দুঃখ আমি আজও ভুলতে পারিনি।
তা হল, স্বাধীন, সাহসী, শক্তিশালী, অপূর্ব সুন্দর এইসব বনের বাঘকে এভাবে শেকলে-বাঁধা জীবন কাটাতে হবে! সে-দেশের আরেক অঞ্চলে আমি একটা বাঘশিশুকে প্রায় কোলে নিয়ে বোতলে করে দুধও খাইয়েছি। আমার উরুর ওপর একটা থাবা রেখে, আরেক থাবায় আমার বোতল ধরা হাত চেপে সে যখন চোঁ চোঁ করে দুধ খাচ্ছিল তখন আনন্দে স্নেহে মায়ায় আমার মন টইটুম্বুর। সেই আনন্দের মধ্যেই চোখে পড়ল তারও গলায় শেকল!
এই শিশু কোনওদিন বনের মধ্যে নিজের মতো স্বাধীন মুক্ত জীবন পাবে না?

অলঙ্করণ– যুধাজিৎ সেনগুপ্ত
“স্বর্ণাক্ষর” থেকে প্রকাশিত ‘চোখে দেখা গল্প’ বই থেকে নেয়া। লেখক ও প্রকাশকের অনুমতিক্রমে।