আকাশে ঘুড়ির পাল

তোমরা নিশ্চয়ই হিউয়েন সাঙের নাম শুনেছ? অনেকেই হয়তো ইতিহাস বইয়ে হিউয়েন সাঙের ভারতভ্রমণের কথা পড়েছ। হিউয়েন সাঙ সেই কোন প্রাচীনকালে চিনদেশ থেকে কত বাধা-বিপদ-ভয়ের মধ্য দিয়ে হেঁটে হিমালয় পর্বত পার হয়ে ভারতে এসেছিলেন ভাবো তো! ভারত ঘুরে তিনি বৌদ্ধধর্মের যত হাতে-লেখা প্রাচীন পুথি সংগ্রহ করেছিলেন, তা সবই তিনি চিনদেশের শিয়ান প্রদেশে ফিরে গিয়ে মস্ত উঁচু একটা প্যাগোডায় অর্থাৎ বৌদ্ধ মন্দিরে সযত্নে রেখে দিয়েছিলেন। শিয়ানের সেই মন্দিরের নাম কী জানো? বুনো হাঁসের মন্দির, ওয়াইল্ড গুজ প্যাগোডা। এই শিয়ান থেকেই হিউয়েন সাঙ ভারতের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিলেন।
কয়েক বছর আগে আমি চিনদেশের ওপর একটা ছবি বানাবার কাজে ছোট্ট একটা ভিডিও হাত ক্যামেরা নিয়ে ঘুরতে ঘুরতে শিয়ান রাজ্যে গিয়ে পৌঁছলাম। তখন আকাশছোঁয়া মন্দিরের গায়ে-মাথায় দিনের আলো নিভে গেছে। শুধু সামনে দাঁড়িয়ে সেই মন্দিরের বাইরের ছবি তুলতে লাগলাম।
পরদিন গুজ প্যাগোডার ভেতরে গিয়ে চোখে আর পলক পড়ে না। সেইসব আশ্চর্য দৃশ্য চিন-ভ্রমণের ভিডিও চিত্রে আছে, এখানে তা বর্ণনার জায়গাও নেই, সুযোগও নেই। বিকেলবেলা হিউয়েন সাঙের নামাঙ্কিত পার্কে গেছি। উঁচু বেদির ওপর তাঁর প্রস্তরমূর্তি। এদিকে মাথার ওপর আকাশ তো ঘুড়িতে ঘুড়িতে ছেয়ে গেছে। কোথাও আমাদের চাঁদমালার মতো ঘুড়ির মালা হাওয়ায় দুলছে, কোথাও আবার বকের সারির মতো ঘুড়ির পাল। একটা বাচ্চা ছেলে দেখলাম পার্কের এ-মাথা থেকে ও-মাথায় দৌড়োচ্ছে, তার হাতে ধরা সুতোয় বাঁধা এক ঝাঁক ঘুড়ি আকাশে যেন খেল দেখাচ্ছে।
আকাশভরা ঘুড়ি দেখতে দেখতে নিজেরই ছোটবেলায় ঘুড়ি ওড়ানো মনে পড়ে গেল। ছোটবেলার নানা রঙের ঘুড়ির কথা বড়ো হয়েও ভোলা কি যায়!

আদ্যিকালের আগুন আর কাগজ

আফ্রিকায় কেনিয়া নামে একটা দেশ আছে জানো নিশ্চয়ই? সেখানকার মাসাই নামে উপজাতিদের কথাও হয়তো শুনেছ। আমি একবার সেই মাসাইদের গ্রামে গিয়ে কাঠ ঘষে আগুন জ্বালানো দেখলাম। বহুকাল আগে, প্রাগৈতিহাসিক যুগে আদি মানুষরা যেভাবে পাথর ঘষে আগুন জ্বালাতে শিখেছিল, চোখের সামনে সেইভাবে মাসাইদেরও কাঠ ঘষে আগুন জ্বালাতে দেখে আমার নিজের চোখকেই বিশ্বাস হচ্ছিল না।
আগুন জ্বালানো বাদে মাসাইদের গ্রামে আর যে তিনটে জিনিস দেখে অবাক হয়েছি, তা হল ঝাঁকে ঝাঁকে মাছির হামলা, পালে পালে গোরু আর মাসাইদের চড়া রঙের পোশাক। পুরুষদের লাল লুঙ্গি, লাল গামছা, মাথায় সিংহের কেশরের মস্ত টুপি, মেয়েদের টকটকে রঙিন কাপড়, কাঠ বা পাথরের রঙিন গয়না। গ্রামের পিছনেই পাহাড়ের শিয়রে লাল-কমলা রঙের নরম সূর্য প্রায় শুয়ে পড়েছে, একটু পরেই সেদিনের মতো অস্ত যাবে—সেদিকে দেখব, না টকটকে লাল-হলুদ রঙের সুন্দর নকশা-কাটা পোশাকে কুচকুচে কালো মাসাই মেয়েদের নাচ দেখব? হাত ধরাধরি করে দুলে দুলে তাদের জীবনকথার নাচ আর বাঁশির মতো মিঠে গলায় সকলের একসঙ্গে গাওয়া গান। মাসাইদের গ্রামে দুপুর থেকে সন্ধে পর্যন্ত সেই দিনটি আমি কোনোদিন ভুলব না।
আগুন জ্বালাতে শেখাই বোধ হয় সভ্যতার দিকে প্রথম আলো দেখানো। আবার সভ্যতার কথা ও কাহিনি, মানুষের ভাব-ভাবনা লিখে বোঝাতে, পাঁচজনের মনে পৌঁছে দিতে কাগজ আবিষ্কারের গুরুত্ব বিরাট। মিশরের একটা দোকানে দেখলাম গাছের কাঁচা ছাল শুকিয়ে প্রাচীন যুগের মতোই পৃথিবীর সেই প্রথম কাগজ তৈরি হচ্ছে। গাছটার নাম তোমরা এতদিনে সবাই জেনে গেছ, প্যাপিরাস। প্যাপিরাস থেকেই প্রথম কাগজ হয়েছে বলে কাগজের নামই হয়ে গেছে ফরাসিতে পাপিয়ে বা ইংরিজিতে পেপার! আমাদের বাংলার ‘কাগজপত্র’-র ‘পত্র’ও হয়তো প্রথমে আমাদের ভাষা-মা সংস্কৃতে এসেছে প্যাপিরাস থেকেই। মিশরের রাজধানী কায়রোর দোকানে এই প্যাপিরাস গাছের ছাল বা বাকল বা সংস্কৃত বল্কল থেকে কাগজ তৈরি করা দেখতে দেখতে ভাবছিলাম প্যাপিরাস মিশরের গাছ, কিন্তু মিশরীয় ভাষায় গাছটার নাম কী? মিশরেও দেখলাম সবাই এই গাছকে প্যাপিরাস বলে। মিশরের রাজধানী কায়রোয় প্যাপিরাসের দোকানও দেখেছি। বড়ো বড়ো দোকান। দোকানের দেওয়াল জুড়ে বাঁধানো ছবি। প্যাপিরাসের ওপর উজ্জ্বল রঙে আঁকা ফারাওদের বর্ণাঢ্য জীবনের ছবি। ফারাও কাদের বলে জানো তো? মিশরের প্রাচীন সম্রাটদের মিশরীয় ভাষায় বলা হত ফারাও।

অলঙ্করণ– যুধাজিৎ সেনগুপ্ত
“স্বর্ণাক্ষর” থেকে প্রকাশিত ‘চোখে দেখা গল্প’ বই থেকে নেয়া। লেখক ও প্রকাশকের অনুমতিক্রমে।
——————————————————
আগের পর্বগুলো- বন্ধু বানরদল, ট্রেন চড়ল জাহাজে, জুনপুটের সন্তোষ মাঝি, নীলনদের ফেরিওয়ালা, তাঁবুতে রাত্রিবাস, পুরনো ডাকাতদলের আস্তানায়, ভেলায় চড়ে ভারত মহাসাগর, আফ্রিকার সেৎসি মাছি ও বুলগেরিয়ার গোলাপ, লঙ্কাদেশের অশোকবনে,ঠাম্মু-দিদুর গল্প বলা, রাত্তিরেতে বেজায় রোদ ও উঠোনে বনের বাঘ