বাংলার মুখ-সিঁধ-তমোঘ্ন নস্কর-বর্ষা ২০২৩

বাংলার মুখ -আগের লেখা –পিসির বাড়ি, মকর সংক্রান্তি ও আলুর দম মেলা , মকরসংক্রান্তির পরব ভেজা বিঁধা,আমাদের বৈশাখী, চুবড়ি মেলা, দগ্ধ দিনের দেখা,শিল কাটা, নকশী কাঁথার বাইশা, ব্যতিক্রমী মাছ ধরা

banglarmukh85

বলেইছি, বৈশাখের দিনে আমরা আমরা বাড়ি না হয় মামার বাড়ি যেতাম। মূল  উপলক্ষ গাজন মেলা। বাসস্ট্যান্ডে নেমে পা ভ্যান চাপতুম। মাঠের মাঝ দিয়ে পিচ ঢালা রাস্তা।  একটা অদ্ভুত দোলাচলে হাওয়া এসে এলোমেলো করে দিচ্ছে চুল, জামাকাপড়, কানে তালা লাগিয়ে দিত শনশন শব্দে। সে এক দারুণ আন্তরিকতা তার, যতই হোক বাড়ির ছেলেরা বাড়ি ফিরছে।

ইতেচুরি ফুলের কষাটে গন্ধ আর সজনে গাছের শীর্ণ শরীরে মাতৃত্বের জোয়ার – এই হলো পাড়া-গ্রামের গরমের অভিজ্ঞান; এয়ো স্ত্রীর নোয়ার মতো শাশ্বত চিহ্ন।

আটচালায় গাজন বসত। অনেক মানুষ সন্ন্যাসী নিতেন, গাজন সন্ন্যাসী যাকে বলে। এরপর কাঠ উঠবে। নীলের উপোস, ঝাঁপ… অনেক তোড়জোড়। তো সেবার তোড়জোড় যখন চূড়ান্ত অবস্থায়, এক সকালে পাশের জ্ঞাতি বাড়িটিতে  দারুণ চিৎকার -চেঁচামেচি উঠল।

আমরা কেবল আগেরদিনই গ্রামের বাড়িতে এসেছি। ঘুম ভাঙার পর তো হতোভম্ব।পাশে মা-বাবাকে দেখলুম না! এই মাঝরাতে সব গেল কই! ভয় যে করছিল না তা নয় কিন্তু কৌতূহলো বড়ো বালাই।

গুটি .গুটি পায়ে. নীচে নেমে পাশের. বাড়ির. দিকে চললুম, আমাদের এত বড়ো ঘরদুয়ার, উঠান সবই প্রায় ফাঁকা! ব্যাপার কী! কেউ-ই বাধা দিলে না।

বাইরে বেরিয়েই দেখি সেখানে তখন তোলপাড় ব্যাপার। হ্যাজাকে হ্যাজাকে দিনের মতো চকচক করছে সব  গোটা গ্রামের লোক লাঠিসোঁটা হাতে এসে জড়ো হয়েছে। আমি ভিড়ের সামনের দিকে জ্যাঠাকে দেখতে পেয়ে টুক করে গিয়ে তার হাত ধরলাম। ভেবেছিলাম বকাঝকা দেবে কিন্তু  না কিছু বললে না।

এতক্ষণে স্পষ্ট হলো বিষয়টা – সিঁধ কেটেছে। জ্ঞাতি ঠাকমাদের যত কাঁসার বাসন, মায় তোরঙ্গটি চাগিয়ে নিয়ে বেরিয়েছে। গর্তটি কেটেছে প্রায় আড়াই হাত পরিমাণ।

দেখলাম পিছনদিকে মাটির ঢিবি করা আছে গুঁড়ো গুঁড়ো মাটির চাঙড়। গর্ত করে এই মাটিই তোলা হয়েছে। পাশে বাসনের পুটলি আর তোবড়ানো তোরঙ্গ।

সুড়ঙ্গ করে ঘরে ঢুকে নিঃশব্দে কাজ হাসিল করে ফেলেছিল ওরা। কিন্তু শেষ বেলায় কফের কাসি ওঠায় ঠাকুমার ঘুম ভাঙে, তাইতেই সব ফেলে ছুটেছে। এই সময় ধান কাটা, ফলে মাঠ ফাঁকা তাই ধরা অসম্ভব। কিন্তু ফেলে গেছে বিস্তর সামগ্রী।

একখানি ছোটো শাবলের মতো যন্ত্র দেখলুম। জ্যাঠা বললেন এর নাম ‘চাপ বাড়ি।’ এই দিয়ে আস্তে আস্তে খোদল করা হয়। লোহার গজালের মতো কিন্তু বেলনের আকারে গোটা কতক লম্বা শলা পড়েছিল, ওইগুলি নানা আকারের ‘উলকি বাড়ি’ বা ‘সিঁধকাঠি।’ প্রথম ঘা ওই দিয়ে হয়। আর দেখলুম একখানা ‘তুরপুন।’ তবে শলাটি মোটা। এই মোট যন্ত্র, এই দিয়েই মাটির দেওয়াল কেটে অনায়াসে সুড়ঙ্গ কাটে সিঁধেল চোর।

সচরাচর দেওয়ালের একেবারে নীচের দিকে বহির্গাত্রে কাটা হয় সিঁধ। তারপর আস্তে আস্তে চাপ দিয়ে বাড়ানো হয় পরিধি। যাতে অনায়াসে মানুষ ঢুকে চুরি করে বেরিয়ে আসতে পারে।

বিশেষ করে মাটির ঘরে এই চুরির দারুন প্রকোপ ছিল সেবার কিন্তু চোরটা ধরা পড়েছিল।

সে .এক. দারুন. ঘটনা। এই ঘটনা. ঘটার. বেশ. কয়েকদিন পর আমরা তখন বাড়ি চলে এসেছি। স্কুল শুরু কিন্তু আবার বিশেষ কারণে শনিবার স্কুল থেকে আমাদের দেশে যেতে হয়েছিল।  ঝিমা উঠানে পড়ে চোট পেয়েছেন।

একরাশ উৎকণ্ঠা নিয়ে ঘরে ঢুকছি। এমন সময় খবর পাওয়া গেল সিঁধ শিল্পীটি ধরা পড়েছেন। মন পড়ে রইল ওখানেই। কিন্তু সাহস পাচ্ছিলাম না। দেখা গেল, ঝিমা কোমরে চোট পেয়েছিলেন এছাড়া কোনো শারীরিক সমস্যা বা বিপদ নেই। এটুকু জানার পরই মেজদা আমার হাত ধরে ছুটল। উদ্দেশ্য চোর ধরা দেখতে বাদল পুকুর যাওয়া।

বাদল পুকুর এক পোড়ো পুকুর।  বাদল নস্কর বলে কোন এক জ্ঞাতিদের পুকুর ছিল সেই পুকুরটি।কেউ পুকুরে স্নান করতে গিয়ে মারা যান। তারপর থেকে যখের পুকুর বলে পুকুরটি পড়ে রয়েছে। একটেরে নাটাকাটা, কলমি, আশপাশের খিরিশ, সিরিশ, সবেদা গাছের পাতা পড়ে পচে গেল। ঝাঁকড়া পুকুর পাড়। দিনেও আলো ঢোকে না।

আজকে কোনো কারণে কেউ বিপদে পড়ে, ওইখানে প্রাতঃকৃত্য করে। এবং তারপর ওই পুকুরে নেমেছিল শৌচ করতে। ব্যস, ক’পা নামতেই পায়ে কীসব ঠেকে। সাহস করে ডুব মারতেই দেখে কি পুকুরের তলায় চকচক করছে, বিস্তর কাঁসার বাসনপত্র সেখানে রাখা। নির্ঘাৎ চোরাই মাল ডুবিয়ে রাখা।

সেই সব বাসনপত্র তোলা হতে তার সঙ্গে একটা পিতলের গ্রহ আংটিও উঠে আসে। সেই আংটি ধরেই সন্ধান পাওয়া যায় চোরের।  তিনি আমাদের পাড়ার লোক।

তারপরের বিভীষণ বর্ণনায় আর যাব না। শুধু এটুকু বলব সেই সুবাদে পুকুরটি কিন্তু মার্জনা পেয়েছিল। আজ সেটা কেটে, মেজে এক বিশাল ফিশারি হয়েছে। অজস্র তেলাপিয়া মাছ খেলা করে বেড়ায় তার বুকে। কোথায় মিলিয়ে গেছে তার বদনাম।

আগামী প্রজন্ম কিছুই জানবে না, বাদল পুকুর জানবে না। সিঁধ জানবে না, শুধু ফিশারি আর তেলাপিয়ার ঝাঁক দিয়ে হবে পরিচয়। তবুও হয়তো দখিনা বাতাসে কখনও ভেসে আসবে এসব গল্প।


জয়ঢাক প্রকাশন থেকে প্রকাশিত ‘দেখি বাংলার মুখ’ থেকে মুদ্রিত। বইটি অর্ডার দিতে পারবেন এইখানে। দেশের ফ্রি ডেলিভারি।dekhibanglarmukh

 

 

Leave a Reply