এইলেখকের আগের গল্প কৃপণের বামমুঠি, দহনভার, পরবাস, সাভান্ত, ছিন্নমূল, স্বপ্নসম্ভব, ব্যথা যখন, শৃঙ্খল, রঙমিলান্তি, বাঁশিওয়ালা

১
ব্রুনো সকালে উঠে কফি খেয়ে অভ্যাসমতো ক্ষেতে চলে এসেছিলেন। কয়েক একর জায়গা জুড়ে তাঁদের কলার ক্ষেত। যতদূর চোখ যায় সবুজে-হলুদে মেশানো স্নিগ্ধ একটা রঙ, তার উপর সকালের নরম আলো এসে পড়েছে। এখন ফল তোলার সময়, সকাল থেকেই কাজ শুরু হয়ে গেছে। মুনিষরা গাছ থেকে কলার কাঁদি কেটে পলিথিনের ব্যাগে করে ট্রাকে তুলছে৷ ট্রাক যাবে দশ কিমি. দূরে কোম্পানির কালেকশন সেন্টারে। কিছু কিছু গাছ তারা ছেড়ে দিয়েছে। ব্রুনো তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখলেন, কলাগুলি তৈরি হতে আরও মাস খানেক লাগবে। তিনি সন্তুষ্ট হয়ে মাথা নাড়লেন।
তাঁকে দেখে তাঁর ম্যানেজার মিগুয়েল এগিয়ে এল। অল্পবয়সি হাসিখুশি ছেলেটি।
ব্রুনো জিজ্ঞেস করলেন, “সব ঠিকঠাক চলছে?”
মিগুয়েল বলল, “তা চলছে, তবে এবারে ফলন ভালো হয়নি আপনি তো জানেন।”
ব্রুনো ঘাড় নাড়লেন। গ্রামের সব খেতেই এই অবস্থা। গ্রামের বাইরে অল্প দূরে বছর দুই হল সিলভানা বলে একটি বহুজাতিক কোম্পানি বিশাল জায়গা জুড়ে জেনেটিক্যালি মডিফায়েড ইউক্যালিপ্টাসের চাষ শুরু করেছে। এই গাছগুলি দ্রুত বড়ো হয় ও প্রচুর জল টানে৷ ফলে আশেপাশের গ্রামগুলিতে ভূগর্ভে জলস্তর নেমে যাচ্ছে। সেই সঙ্গে ওরা বেশি মাত্রায় কীটনাশক ব্যবহার করে কারণ, কীটনাশকে এই গাছগুলির ক্ষতি হয় না। সেটাও আশেপাশে ছড়িয়ে পড়ছে। প্রথম বছর অত বোঝা যায়নি, কিন্তু এ-বছর থেকে কলাগুলি শীর্ণকায়, ফ্যাকাসে মতন হয়ে যাচ্ছে। স্বাদও আর আগের মতো নেই। যারা কেনে সেই কোম্পানির প্রতিনিধি জানিয়েছেন, এভাবে চললে তাঁদের ভেবে দেখতে হবে।
এই সময় আকাশ থেকে ঘটঘট শব্দ ভেসে এল। ব্রুনো মুখ তুলে দেখলেন একটি হেলিকপ্টার ধীরে ধীরে গ্রামের বাইরে নেমে আসছে। তাঁরা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন। কপ্টারটি একসময় মাটি থেকে সামান্য উপরে স্থির হয়ে ভেসে রইল। কয়েক মুহূর্ত পরে তার পেট থেকে নীলচে ধোঁয়ার মতো কিছু বেরিয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল।
মিগুয়েল চিৎকার করে বলল, “শালারা এবার আকাশ থেকে পোকা মারার বিষ ছড়াচ্ছে।” সে উপরে হাত তুলে ঘুসি পাকিয়ে অশ্রাব্য ভাষায় গালগাল দিতে লাগল।
ব্রুনো চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন।
২
জাকার্তায় সিলভানার স্থানীয় অফিসে লুকা তাঁর দশতলার ঘর থেকে নীচে দেখছিলেন। সেভিকো ভালোই লোক জড়ো করেছে। অনেকের হাতেই প্লাকার্ড। মুষ্টিবদ্ধ হাত শূন্যে ঝাঁকিয়ে সমবেত স্লোগান চলছে। পথচারীরাও অনেকে যেতে যেতে দাঁড়িয়ে পড়েছে। মিডিয়ার লোকজন মহা উৎসাহে ছবি তুলছে, বিক্ষোভকারীদের বাইটও নিচ্ছে। এদের নেতা রেজাকে উপর থেকেও চেনা যাচ্ছে। রেজার সঙ্গে লুকার মুখোমুখি দেখা হয়নি, তবে মিডিয়ায় ছবি দেখেছেন। আরও পাবলিসিটি হবার আগে এদের সঙ্গে কথা বলা উচিত, নয়তো সেটাও একটা ইস্যু হয়ে যাবে। তিনি ইন্টারকম তুলে কথা বললেন।
একটু পরে লুকার মুখোমুখি বসে রেজা ও আরও দুজন। এঁরা সকলেই স্থানীয় লোক, তবে লুকা জানেন, প্যারিসে সেভিকোর সদর দপ্তর থেকে এদের কাছে নিয়মিত আর্থিক ও অন্যান্য সাহায্য আসে। রেজার বয়স আনুমানিক চল্লিশের কাছে, ছোটোখাটো শান্ত নির্বিরোধী চেহারা। তিনি উচ্চশিক্ষিত, বাইরে পড়াশুনো করে সেখানেই একটি নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াতেন; এখন সে-সব ছেড়ে দেশে ফিরে পরিবেশ ও বাস্তুতন্ত্র রক্ষার আন্দোলনে যোগ দিয়েছেন। লুকার সঙ্গে মুখোমুখি দেখা এই প্রথম।
লুকা ভূমিকা না করে মূল প্রসঙ্গে গিয়ে বললেন, “টিভিতে আপনাদের বক্তব্য শুনছিলাম। আমি সিলভানার পক্ষ থেকে কিছু তথ্য আপনাদের সামনে রাখতে চাই। আপনাদের একটি প্রধান আশঙ্কা, এখানে আমাদের প্রস্তাবিত জি.এম. ট্রি প্ল্যান্টেশন পোলেন বা পরাগ রেণুর মাধ্যমে আপনাদের প্রাকৃতিক অরণ্যেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। সেক্ষেত্রে বায়ো-ডাইভার্সিটি এবং ইকোসিস্টেমের উপর গুরুতর প্রভাব পড়বে।”
রেজা সম্মতিসূচক ঘাড় নাড়লেন। লুকা বললেন, “অন্তত আমাদের প্রোজেক্টের ক্ষেত্রে সেরকম হবার সম্ভাবনা প্রায় শূন্য, কারণ আমাদের প্ল্যান্টেশন সাইট এমনভাবে বাছা হয়েছে যে চারদিকে ধারেকাছে কোনও বনভূমি নেই। কাজেই জেনেটিক পরিবর্তন শুধুমাত্র আমাদের প্ল্যান্টেশনের গাছগুলির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে।
“আপনাদের অন্য আশঙ্কা হল এই গাছগুলি পেস্টিসাইড-রেজিস্ট্যান্ট অর্থাৎ কীটনাশক এদের বিশেষ ক্ষতি করতে পারে না। তাই আমাদের দিক থেকে অতিরিক্ত কীটনাশকের ব্যবহারের সম্ভাবনা থেকে যায়। এ-ব্যাপারে আমরা স্থানীয় সরকারের সিদ্ধান্ত মেনে চলব এবং যাবতীয় তথ্য পাবলিক ডোমেনে রাখা হবে। আপনি হয়তো জানেন, এই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী জি.এম. গাছের জন্য আকাশ থেকে কীটনাশক স্প্রে করা নিষিদ্ধ করা হয়েছে, জমিতে স্বল্পমাত্রায় প্রয়োগ করা যেতে পারে। কাজেই পরিবেশে ও খাদ্যশৃঙ্খলে কীটনাশকের প্রভাব নির্দিষ্ট সীমার থেকেও অনেক কম থাকবে।”
তিনি একটু থেমে রেজাকে দেখলেন। তারপর বললেন, “আপনাদের আরও কোনও প্রশ্ন থাকলে সেটাও আমরা আলোচনা করতে পারি।”
রেজা মৃদু হাসলেন। বললেন, “আপনাদের উদ্যোগ প্রশংসনীয়। এগুলি সবই সঠিক পদক্ষেপ। আর একটা ব্যাপার আপনি উল্লেখ করেননি। সেটা হল জি.এম. গাছে সাধারণত জলের ব্যবহার বেশি হয়। ফলে জলস্তর নেমে গিয়ে সংলগ্ন এলাকায় কৃষি ও অন্যান্য কাজের জন্য জলসংকট দেখা দিতে পারে। এ-ব্যাপারেও আপনারা নিশ্চয়ই চিন্তাভাবনা করেছেন?”
লুকা বললেন, “অবশ্যই। আমাদের জি.এম. গাছগুলি সে-কথা মাথায় রেখেই করা হয়েছে।” তিনি টেবিলের ড্রয়ার খুলে একটি ফাইল বার করে রেজার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, “এটা পড়ে দেখতে পারেন। এতে ল্যাব ট্রায়ালের যাবতীয় তথ্য দেওয়া আছে।”
রেজা একবার চোখ বুলিয়ে বললেন, “বাহ্। খুব ভালো।”
লুকার সেক্রেটারি মেয়েটি হাসিমুখে ট্রেতে করে চায়ের সরঞ্জাম নিয়ে এল। রেজা দুধ-চিনি খান না, তিনি কাপে লিকার ঢেলে নিলেন। অন্যরা যে-যার মতো বানিয়ে নিলেন।
রেজা চায়ে চুমুক দিয়ে বললেন, “আর একটা কথা শুনেছি, আপনাদের গাছগুলি স্বাভাবিক গাছগুলির তুলনায় অনেক বেশি কার্বন শোষণ করতে পারে। তাই কিছুদিনের মধ্যেই এলাকার বাতাসে কার্বনের পরিমাণ অনেক কমে যাবে। এর কৃতিত্ব অবশ্যই আপনাদের মুখ্য বৈজ্ঞানিক ড. অহিভূষণকে দিতে হবে। হি ইজ আ জিনিয়াস। অবশ্য এর জন্য আপনারা অতিরিক্ত কার্বন ক্রেডিট পাবেন এবং সেটা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে বিক্রিও করতে পারবেন। কিন্তু তাতে আমি অন্তুত দোষের কিছু দেখি না। শত হলেও আপনারা ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান।”
লুকা সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন।
রেজা মৃদু গলায় প্রায় চিন্তা করার ভঙ্গিতে বললেন, “ব্যক্তিগতভাবে আমার অবশ্য ছোটো একটা সংশয় আছে। আপনারা যে জায়গাটা বেছেছেন, তার উত্তরে পঞ্চাশ কিমি. দূরে ইন্দোনেশিয়ার একটি প্রধান বনভূমি শুরু হচ্ছে। আমি শুনেছি একটি গাছের পোলেন বা পরাগ রেণু কয়েকশো কিমি. পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়তে পারে। সেক্ষেত্রে এই জি.এম. গাছগুলি কি আমাদের অরণ্যেও ছড়িয়ে পড়তে পারে মনে হয়?”
লুকা সতর্ক হলেন। এই প্রশ্নের উত্তর তাঁর কাছে অন্তত নেই। হেড-কোয়ার্টার থেকেও এ-ব্যাপারে তিনি পরিষ্কার উত্তর পাননি। তিনি সামলে নিয়ে বললেন, “ব্যতিক্রম হতেই পারে। তবে এখন অবধি চায়না ও ব্রাজিলে যে দুটি জি.এম. প্ল্যান্টেশন করা হয়েছে, সেখান থেকে এরকম কোনও রিপোর্ট পাওয়া যায়নি।”
রেজা সন্তুষ্টভাবে ঘাড় নাড়লেন। বললেন, “তাছাড়া আপনারা তো ফরেস্ট সার্টিফিকেশন বোর্ড বা এফ.এস.বি-র কাছ থেকে সার্টিফিকেট নেবেন। যাবতীয় ইস্যু তারা নিশ্চয়ই খতিয়ে দেখবে।”
এফ.এস.বি হল এমন একটি সংস্থা যারা যে-কোনো বনজ দ্রব্য বা ফরেস্ট প্রোডাক্টকে পরিবেশ সহায়ক বলে সার্টিফিকেট দেয়৷ এটি বাধ্যতামূলক নয়, তবে পরিবেশ ও বাস্তুতন্ত্র বিষয়ে দায়বদ্ধতা যেহেতু বাড়ছে, এদের সার্টিফিকেট ছাড়া কোনও প্রোডাক্ট আন্তর্জাতিক বাজারে বিক্রি করা বেশ কঠিন।
রেজা উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, “আপনার সঙ্গে কথা বলে খুব ভালো লাগল। আপনার বক্তব্য আমরা অবশ্যই নিজেদের মধ্যে আলোচনা করব।”
তিনি দুই সঙ্গীকে নিয়ে বিদায় নিলেন। লুকা কপালে ভাঁজ ফেলে বসে রইলেন। রেজা এত লোকজন নিয়ে কেন এসেছিলেন, কেনই-বা এত সহজে মেনে নিলেন?
***
পরের দিন সকালে উঠে কাগজ খুলে লুকা চমকে উঠলেন। প্রথম পাতায় রেজার ইন্টারভিউ। গতকাল লুকা যা বলেছিলেন, প্রতিটি পয়েন্ট রেজা উল্লেখ করেছেন এবং তথ্য ও যুক্তি সহকারে খণ্ডন করেছেন। লেখাটা পড়লে সিলভানাকে মুনাফাসর্বস্ব দায়িত্বজ্ঞানহীন এক সংস্থা ছাড়া অন্য কিছু মনে হয় না।
তিনি পাতাটা স্ক্যান করে হেড-কোয়ার্টারে তাঁদের চিফ পাবলিসিটি অফিসার ক্যামিলাকে পাঠালেন। দশ মিনিট পরে ক্যামিলা ফোন করলেন। তিনি ক্ষুব্ধ গলায় বললেন, “হি হ্যাজ টেকন আস ফর আ রাইড লুকা। এতদিন আমরা স্ট্র্যাটেজিক্যালি ওর সঙ্গে বিতর্কে জড়াইনি। জেনারেল স্টেটমেন্ট দিয়ে কাজ সেরেছি। লোকে একতরফাভাবে ওর কথা শুনেছে। এখন আমাদের তাস ও দেখে নিয়েছে এবং পালটা যুক্তি দিয়ে নস্যাৎ করেছে। এখন পাবলিক সেন্টিমেন্ট ওর দিকে ঘুরে গেলে আশ্চর্য হব না।”
লুকা চুপ করে রইলেন।
ক্যামিলা বললেন, “আর একটা খবর তুমি বোধ হয় জানো না। আগামী সপ্তাহে কিওতে সিলভানার এই প্রোজেক্টের অনুমোদন দেওয়ার ব্যাপারে এফ.এস.বি সংশ্লিষ্ট সকলকে নিয়ে মিটিং ডেকেছে। সেভিকো থেকে রেজাকেই পাঠাচ্ছে। তুমি কাল হয়তো দেখেছ ও শুধু পন্ডিত নয়, ভালো বক্তাও, ঠান্ডা মাথায় গুছিয়ে নিজের বক্তব্য রাখতে পারে।”
লুকা জিজ্ঞেস করলেন, “আমাদের দিক থেকে কে থাকছেন?”
ক্যামিলা বললেন, “এ ব্যাপারে একজনই আমাদের সাহায্য করতে পারেন। ড. অহিভূষণ নিজে। গেট ইন টাচ উইথ হিম, লুকা। আস্ক হিম টু রিপ্রেজেন্ট আস ইন দ্য মিটিং। আমি নিজেও থাকব।”
লুকা বিস্মিত হয়ে বললেন, “ক্যামিলা, হি মে বি আ জিনিয়াস, কিন্তু মূলত একজন বিজ্ঞানী। মনে হয় এফ.এস.বি-র কর্তারা অনুমোদন দেবার আগে সামাজিক ও নৈতিক দিকটাই বেশি গুরুত্ব দেবেন।”
ক্যামিলা শান্ত গলায় বললেন, “ডোন্ট আন্ডার-এস্টিমেট হিম লুকা। উনি অনেক দূর অবধি দেখেন। তাছাড়া বৈজ্ঞানিক মহলও ওঁকে বিশেষ সম্মানের চোখে দেখে।”
৩
কর্মসূত্রে অনেক দেশে গেলেও জুরিখে ঈশিকার এই প্রথম আসা। কাল থেকে এখানে রাষ্ট্রসংঘের ক্লাইমেট চেঞ্জ কনফারেন্স শুরু হবে। বিভিন্ন দেশ থেকে প্রতিনিধিরা আসতে শুরু করেছেন। এঁরা যে হোটেলে আছেন, ঈশিকার হোটেল থেকে কাছেই। সেখানে ও আশেপাশে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা। আজ সে পায়ে হেঁটেই শহরটা ঘুরে দেখছিল। অন্য অনেক বিখ্যাত শহরের তুলনায় রাস্তাঘাট ঝকঝক তকতক করছে, এক কুচি ধুলো অবধি নেই। এছাড়া প্রাকৃতিক সৌন্দর্যও অসাধারণ, অনেক জায়গা থেকেই আল্পস দেখা যায়৷ তার হোটেল থেকে একটু দূরেই লেক জুরিখ। সে লেকের ধার ধরে অনেকক্ষণ হাঁটল, রাস্তার ধারে একটা দোকানে বসে চিজ ফন্ডু খেল। দু-একটা বুটিকে ঢুকে দেখল গলাকাটা দাম৷
অনেকক্ষণ ঘুরে পা দুটিকে বিশ্রাম দেবার জন্য সে হোটেলে ফিরে এল। ঘরে না ঢুকে সে কফি মেশিন থেকে এককাপ কফি নিয়ে এসে লবিতেই বসল। লবিতে চুপচাপ বসে মানুষজন দেখতে তার ভালোই লাগে। অনেক মানুষের সঙ্গে আলাপও হয়ে যায়। অল্পবয়সি হাসিখুশি চেহারার একটি মেয়েকে একা বসে থাকতে দেখে অনেকেই কৌতূহলী হয়ে এসে আলাপ করে। তারও দিব্যি সময় কেটে যায়।
আজও একটু পরে সুদর্শন এক যুবক সোফায় এসে বসল। চেহারা দেখে ঈশিকার ইতালিয়ান বলে মনে হল। চোখাচোখি হতে ছেলেটি হাসল, সেও। আলাপ হয়ে গেল। তার অনুমান ঠিক, ছেলেটি ইতালির এক বিখ্যাত পত্রিকা থেকে তারই মতো সম্মেলন কভার করতে এসেছে। নাম বলল, লরেঞ্জো। একই কাজে দুজনে এসেছে তাই আড্ডা জমে গেল। বিদেশিদের সঙ্গে আলাপ করতে গিয়ে আগে ঈশিকার একটা ব্যাপারে অস্বস্তি হত, সে অনেক দেশের ব্যাপারে মোটামুটি ওয়াকিবহাল হলেও এরা ইন্ডিয়া সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানে না। ইদানীং অবশ্য অবস্থা পালটাচ্ছে। তাছাড়া লরেঞ্জো সাংবাদিক বলে অনেক খবর-টবর রাখে, এমনকি ঈশিকার শহর কলকাতা যে ব্রিটিশ আমলে দেশের রাজধানী ছিল সেটাও জানে।
কিছুক্ষণ এ-কথা সে-কথার পর সম্মেলন নিয়েও কথা হল, কোন দেশ থেকে কে আসছেন, কে আসছেন না। ঈশিকা বলল, “তোমার কী মনে হয়, এবারে কিছু কাজের কাজ হবে?”
লরেঞ্জো কিছু বলতে যাচ্ছিল, এই সময় লবির ঘড়ির দিকে চোখ পড়তে চমকে উঠে বলল, “সরি, আমার এক বন্ধুর সঙ্গে দেখা করার কথা৷ কিন্তু তুমি কি আজ সন্ধ্যাবেলা ফ্রি আছ? তাহলে আমরা একসঙ্গে ডিনার করতে পারি? তখন কথা বলা যাবে।”
ঈশিকা হেসে বলল, “আনন্দের সঙ্গে।”
সন্ধ্যাবেলা হোটেল থেকে অল্প দূরে একটি রেস্তোরাঁয় দুজনে বসে ছিল। লরেঞ্জো ঈশিকার অনুমতি নিয়ে ওয়াইন লিস্ট থেকে একটা ইতালিয়ান ওয়াইন অর্ডার করেছে। ঈশিকা ওয়াইন রসিক নয়, তবু খেয়ে তার দিব্য লাগল। লরেঞ্জোকে বলতে সে খুশি হয়ে বলল, “আই টোল্ড ইউ, ইউ উড লাভ ইট।”
আবার গল্প শুরু হল। ঈশিকা জিজ্ঞেস করল, “তোমাদের হেড-অফিস তো মিলানে। তুমি কি ওখানেই থাকো?”
লরেঞ্জো বলল, “আনফরচুনেটলি ইয়েস। আমাদের পৈতৃক বাড়ি মিলান থেকে কিছুটা দূরে একটা গ্রামে। আমার ছোটোবেলা সেখানেই কেটেছে। বাবা-মা ওখানেই আছেন। ভাগ্যক্রমে গ্রামটা এখনও অনেকটা আগের মতোই আছে। খোলামেলা, সবুজ। বুকভরে শ্বাস নেওয়া যায়। মাঝে-মধ্যে ঘুরে আসি।”
ঈশিকা বলল, “মিলানে আমি যাইনি, তবে শুনেছি খুব সুন্দর শহর।”
লরেঞ্জো বলল, “অনলি ফর ট্যুরিস্টস। যারা থাকে তাদের জন্য মিলান একটা ঘিঞ্জি দূষিত শহর। আমার ছেলেটা ওই বাতাসে শ্বাস নিয়ে বড়ো হচ্ছে ভাবলে খারাপ লাগে।”
ঈশিকা বিষণ্ণ গলায় বলল, “এই সমস্যা বোধ হয় সব বড়ো শহরেই। আমাদের দেশেও দিল্লি, মুম্বই, কলকাতা সব শহরের অবস্থা করুণ। হাসপাতালগুলিতে যত রোগী আসে তাদের বেশিরভাগ দূষণজনিত রোগে ভুগছে। অনেক কেসই দুরারোগ্য। সকালে হাঁটতে বেরোলে মনে হয় কুয়াশায় দু-হাত দূরে দেখা যায় না। সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে গরম বাড়ছে।”
দুজনেই কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর ঈশিকা আবার বলল, “তোমার কী মনে হয়, এবারে এখানে কাজের কাজ কিছু হবে?”
লরেঞ্জো অবাক হয়ে বলল, “আর ইউ কিডিং? হবার সুযোগ কোথায়? প্রথম বিশ্বের দেশগুলি নিজেদের গা বাঁচিয়ে অবাস্তব একটা টার্গেট রাখবে। চায়না বা ইন্ডিয়ার মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলি নিজেদের তাগিদেই তাতে রাজি হবে না। এই গল্প তো অনেকদিন ধরে দেখে আসছি।”
ঈশিকা চুপ করে রইল। লরেঞ্জো বলল, “তাছাড়া তুমি নিশ্চয়ই জানো, শিল্পায়নের আগে পৃথিবীর বাতাসে কার্বন লেভেল যা ছিল, এখন সেটা বাড়তে বাড়তে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। এখন শুধু এমিশন কন্ট্রোল করাই যথেষ্ট নয়, বাতাস থেকে এই কার্বন কমাতে হবে।”
ঈশিকা বলল, “একটা সম্ভাবনা আজকাল শুনি, জি.এম. ট্রি। এরা নাকি বাতাস থেকে তুলনায় বেশি কার্বন শুষে নিতে পারে। যদিও পরিবেশবিদরা এর ঘোরতর বিরোধী। এ নিয়ে কিছু জানো?”
লরেঞ্জো বলল, “কিছুটা। দু-হাজার দুই সালে চায়নায় প্রথম একটি জি.এম. প্ল্যান্টেশন করা হয়েছিল। স্থানীয় মানুষরা এর বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেমেছিল, পরে কী হয়েছিল ঠিক জানি না। আমেরিকায় প্রথম প্রকল্পের কথা হয়েছিল ২০১৫ সালে। সরকারি অনুমোদনও পাওয়া গেছিল, কিন্তু পরিবেশবিদদের চাপে ও আন্দোলনে সে প্রোজেক্ট শুরু করা যায়নি। দু-হাজার আঠারো সালে সিলভানা নামে একটি বহুজাতিক কোম্পানি ব্রাজিলে জেনেটিক্যালি মডিফায়েড ইউক্যালিপ্টাস গাছের চাষ শুরু করে। এই প্রকল্পটি এখনও চলছে, তবে আশেপাশের গ্রামগুলির কৃষক সংগঠন এদের কাছে জমি ও ফসল নষ্ট হওয়ার জন্য বিপুল অঙ্কের ক্ষতিপূরণ চেয়ে কোর্টে মামলা করেছে, সেটি বিচারাধীন। এখন এরাই ইন্দোনেশিয়ায় নতুন প্রযুক্তির জি.এম. গাছের একটি প্ল্যান্টেশন করতে চায়, সে দেশের সরকার অনুমতিও দিয়েছে। কিন্তু ব্যবসায়িক সাফল্যের জন্য এদের এখন এফ.এস.বি বা ফরেস্ট সার্টিফিকেশন বোর্ডের অনুমতি দরকার।”
ঈশিকা উত্তেজিতভাবে বলল, “এক মিনিট দাঁড়াও তো, কিছু দেখেছিলাম মনে হচ্ছে।” সে মোবাইলে কিছু সার্চ করে বলল, “পেয়েছি। এফ.এস.বি এক সপ্তাহ পরে টোকিওতে এদের অনুমোদন দেওয়ার ব্যাপারে মিটিং ডেকেছে।”
লরেঞ্জো এটা জানত না৷ সে হেসে বলল, “তাহলে তো তোমার সঙ্গে আর একবার দেখা হতে পারে। দেখি আমার এডিটরকে বলে।” তারপর সে চোখ টিপে বলল, “তোমাকে একটা টিপস দেব? বদলে আমার কিছু চাই না, পরে কখনও সুযোগ হলে শোধ দিও।”
ঈশিকা হেসে বলল, “বুঝেছি। বলে ফ্যালো।”
লরেঞ্জো বলল, “এই প্ল্যান্টেশনে যে বিশেষ গাছগুলি রোপণ করা হবে, তাদের জেনেটিক ডিজাইন তোমাদের শহরের এক বিখ্যাত বিজ্ঞানীর করা। ড. অহিভূষণ চ্যাটার্জি।”
ঈশিকার চোখ কপালে উঠে গেল। বলল, “এটা ভালো খবর দিলে। উনি অবশ্য মিডিয়াকে এড়িয়ে চলেন, তবু ফিরে গিয়ে একবার চেষ্টা করে দেখব।”
৪
অহিভূষণের সঙ্গে এবারে আলাপ করা যাক। অহিভূষণের বয়স পঁয়ষট্টির কাছাকাছি, যদিও দেখে বোঝার উপায় নেই। ঋজু, অভিজাত, নির্মেদ চেহারা, সৌম্য মুখশ্রী, চুলে সামান্য রুপোলি রেখা। তাঁর স্ত্রী অনেকদিন গত হয়েছেন, একমাত্র ছেলে ব্যাঙ্গালোরে চাকরি করে। কলকাতার উপকণ্ঠে বিশাল দোতলা বাড়িতে তিনি একাই থাকেন। বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর পঞ্চাশটির উপর পেটেন্ট আছে এবং সেগুলির অধিকাংশই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করছে। তাঁর আবিষ্কারগুলির মধ্যে বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানীমহলে সাড়া ফেলে দিলেও তাঁর কিছু কাজের দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক ও অন্যান্য প্রভাব নিয়ে বিতর্ক আছে। তিনি সভাসমিতিতে বিশেষ যান না, মিডিয়াকেও পারতপক্ষে এড়িয়ে চলেন, তবু তিনি এই শহরের অন্যতম প্রধান সেলিব্রিটি। মূলত পদার্থবিদ হলেও তাঁর প্রতিভা বহুমুখী। বছর দুই ধরে তিনি নিউরো-সায়েন্স এবং জেনেটিক্স নিয়ে কাজ শুরু করেছেন।
আপাতত তিনি তাঁর বসার ঘরে প্রিয় বন্ধু সোমকের সঙ্গে বসে আছেন। সোমক রিটায়ার্ড আই.পি.এস. অফিসার, দক্ষ ও কর্মঠ বলে বিশেষ সুনাম ছিল। পেশার সূত্রে অনেক বিষয়ে তাঁর আগ্রহ, এখনও চর্চা করেন। জটিল কেসে তাঁর প্রাক্তন জুনিয়র কলিগরা এখনও তাঁর পরামর্শ নিতে আসেন। অহিভূষণ তাঁর এই বন্ধুটিকে বিশেষ পছন্দ করেন, নিজের গবেষণার ব্যাপারে আলোচনাও করেন।
একটু আগে কাজের লোকটি কফি দিয়ে গেছে। সোমক শেষ চুমুক দিয়ে অন্যমনস্কভাবে কাপটি টেবিলে নামিয়ে রাখলেন৷ অহিভূষণ একটু আগে তাঁকে জি.এম. ট্রি নিয়ে তাঁর গবেষণার কথা বিশদে বলেছেন। অহিভূষণের কফি শেষ হওয়া পর্যন্ত তিনি অপেক্ষা করলেন। তারপর বললেন, “তোকে একটা কথা বলব? তুই কি বিতর্কিত বিষয় ছাড়া কাজ করতে পারিস না?”
অহিভূষণ হেসে ফেললেন। বললেন, “বিতর্ক না হলে কাজ ঠিক পথে এগোচ্ছে কি না বুঝব কী করে? যাক গে, টোকিওতে কুড়ি তারিখে বোর্ডের মিটিং আছে। তার আগে যুক্তি, পালটা যুক্তি তোর সঙ্গে একটু ঝালিয়ে নেওয়া যাক। শুরু কর।”
সোমক একটু ভেবে বললেন, “কীটনাশকের প্রভাব বা জলস্তর নেমে যাওয়া তবু সামলানো যায়, তবে আমার মতে সবথেকে বিপজ্জনক হল জি.এম. প্ল্যান্টেশন থেকে পোলেনের মাধ্যমে কাছে বা দূরের স্বাভাবিক অরণ্যগুলিতে জিন ফ্লো এবং গাছগুলির ছড়িয়ে পড়ার প্রবণতা। এর ফলে অরণ্যের স্বাভাবিক চেহারা পালটে যাবে এবং একদিন গোটা পৃথিবীর বায়ো-ডাইভারসিটি ও ইকোসিস্টেম বিপন্ন হতে পারে। ভেবে দ্যাখ, লক্ষ-কোটি বছর ধরে প্রকৃতি ধীরে ধীরে এই ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। তাছাড়া অসংখ্য মানুষও এর উপরে নির্ভরশীল।”
অহিভূষণ চিন্তিত মুখে বললেন, “ঠিক বলেছিস। এটাই প্রধান ঝুঁকি। আমি অবশ্য জেনেটিক ডিজাইনে কিছু সতর্কতা নিয়েছি। দেখা যাক অবস্থা কী দাঁড়ায়।” তারপর বললেন, “ভালো কথা, আঠারো তারিখ রাতে আমাদের ফ্লাইট, ব্যাগ গুছিয়ে রাখিস।”
সোমক চমকে উঠে বললেন, “মানে? আমি ওখানে গিয়ে কী করব?”
অহিভূষণ তাঁর কাঁধে চাপড় মেরে বললেন, “তুই আমার ফ্রেন্ড, ফিলসফার অ্যান্ড গাইড হয়ে যাবি। এবারে আয়, আমার কিছু কাজ বাকি আছে।”
৫
রেজা টোকিওর হোটেলে চেক-ইন করার প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই ফোনটা এল। ও-প্রান্তে সুজান, সেভিকোর প্রধান। বললেন, “আমি তোমাকে একটা ভিডিও ক্লিপ পাঠাচ্ছি। ব্রাজিলে দু-হাজার আঠারো সালে যে জি.এম. প্ল্যান্টেশন হয়েছিল, তার পাশের গ্রামের এক চাষির ইন্টারভিউ। কালকের প্রেজেন্টেশনে এটা দেখাতে পারো।”
রেজা ঘাড় নেড়ে বললেন, “ধন্যবাদ। আমি দেখে নিচ্ছি।”
সুজান বললেন, “আর একটা কথা। কাল মিটিংয়ের সময় হোটেলের বাইরে প্ল্যাকার্ড ইত্যাদি নিয়ে বিক্ষোভ হতে পারে। তুমি তার মধ্যে জড়িও না। আফটার অল, তুমি আমাদের অফিশিয়াল প্রতিনিধি।”
রেজা বললেন, “ঠিক আছে।”
“অ্যান্ড রেজা…”
“বলুন।”
“ওয়াচ আউট ফর অহিভূষণ।”
রেজা মৃদু হেসে বললেন, “আই উইল, সুজান।”
সোমকরা টোকিওর হোটেলে যখন ঢুকলেন, স্থানীয় সময় সন্ধ্যা প্রায় ছ’টা। বড়ো হোটেল, রিসেপশনে হাসিমুখে কর্মীরা দাঁড়িয়ে, সেই সঙ্গে পাশে সারি সারি সেলফ চেক-ইন কিওস্কও আছে। যে জাপানি মেয়েটি তাদের এয়ারপোর্ট থেকে নিয়ে এসেছে, দুজনের পাসপোর্ট চেয়ে নিয়ে একটা কিওস্কের সামনে বসে গেল।
কলকাতা থেকে দিল্লি, সেখান থেকে টোকিও ডাইরেক্ট ফ্লাইট। সবমিলিয়ে প্রায় বারো ঘণ্টার পর্ব। এয়ারপোর্টেও ইমিগ্রেশনের জন্য লম্বা লাইন ছিল, অহিভূষণের ভি.আই.পি পাসপোর্ট থাকায় সময় লাগেনি। সোমক দেখলেন বিভিন্ন কাউন্টারে এবং অন্যান্য কাজে নেপাল থেকে আসা প্রচুর ছেলেমেয়ে, দু-একজন ভারতীয়ও আছে। এদের জনসংখ্যা ক্রমশ কমছে তাই ইমিগ্র্যান্টদের উপর নির্ভর করতেই হয়। তবে কাজে যোগ দেওয়ার আগে এক বছর জাপানি ভাষা শেখা বাধ্যতামূলক।
মেয়েটি চেক-ইন করে এসে তাঁদের পাসপোর্ট ও দুটি কি কার্ড দিয়ে বলল, “কাল সকাল ন’টায় আমি আপনাদের নিতে আসব। মাঝে কিছু দরকার হলে অবশ্যই আমাকে ফোন করবেন।”
সে হাসিমুখে বিদায় নিয়ে চলে গেল।
অহিভূষণ সুটকেস তুলে নিয়ে বললেন, “চল, যাওয়া যাক। সাড়ে আটটায় লবিতে চলে আসিস। কাছেই একটা দুর্দান্ত রামেন রেস্টুরেন্ট আছে, সেখানে যাব। তবে প্রচণ্ড ভিড় হয়, বেশ কিছুক্ষণ লাইনে দাঁড়াতে হতে পারে।”
সোমক ঘাড় নেড়ে নিজের রুমে চলে এলেন। ফ্রেশ হয়ে, পোশাক পালটে আবার বেরিয়ে পড়লেন। ক্লান্তি থাকলেও নতুন জায়গায় এসেই আশপাশটা পায়ে হেঁটে একটু দেখে নেওয়া তাঁর স্বভাব। তাঁদের হোটেলটা বড়ো রাস্তার প্রায় উপরেই। সাড়ে ছ’টা বাজে। ধীরে ধীরে সন্ধ্যা নামছে। রাস্তায় ট্রাফিক আছে, তবে খুব সাংঘাতিক কিছু নয়। কিছু লোক বোধ হয় অফিস-ফেরত রাস্তা দিয়ে নিঃশব্দে হেঁটে যাচ্ছে। কোথাও কফি শপে ছেলেমেয়েরা আড্ডা দিচ্ছে। রাস্তাঘাট ঝকঝকে পরিষ্কার। তবে অনেকটা হেঁটেও কোথাও ট্র্যাশ-ক্যান চোখে পড়ল না। এরা টুকটাক জিনিস ফেলে কোথায় কে জানে।
জাপান সম্বন্ধে অনেকের মতোই সোমকের কয়েকটি ধারণা ছিল, যেমন জাপানিরা প্রচণ্ড শৃঙ্খলাপরায়ণ, অসম্ভব হেল্পফুল এবং টোকিও খুব কস্টলি শহর। এর মধ্যে দ্বিতীয়টির প্রমাণ ফেরার সময় পেলেন। রাস্তা একটু গুলিয়ে গেছিল। মোবাইল আনেননি, অগত্যা পথচলতি একটি ছেলেকে জিজ্ঞেস করলেন। সে হাসিমুখে বলল, “আমার সঙ্গে আসুন।”
সে সোমককে প্রায় হোটেলের গেট অবধি এগিয়ে দিল। তারপর প্রায় দৌড়াতে লাগল। সোমক বুঝলেন, তাঁকে রাস্তা দেখাতে গিয়ে ছেলেটির দেরি হয়ে গেছে। তিনি নিজের মনেই হাসলেন।
রিসেপশন থেকে চাবি দেওয়ার সময় মেয়েটি হাসিমুখে বলল, “লবিতে আপনার জন্য একজন অপেক্ষা করছেন।”
সোমক বিস্মিত হয়ে পেছনে তাকালেন। একটি তরুণী তাঁকে দেখে উঠে এসে হাসিমুখে বলল, “গুড ইভনিং স্যার, আমি ঈশিকা, কলকাতার একটা কাগজ থেকে কালকের মিটিংটা কভার করতে এসেছি। আপনার সঙ্গে একটু কথা বলতে পারি?”
ঈশিকা নামটা সোমকের চেনা চেনা লাগল। তারপর মনে পড়ল, ঈশিকা বসু বলে একটি মেয়ে কলকাতার একটি নামকরা কাগজে নিয়মিত লেখে। লেখার হাতটি বেশ ভালো, পাঠকমহলে ইতোমধ্যেই বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।
দুজনে পাশের একটি সোফায় গিয়ে বসলেন। দু-চারটে মামুলি কথার পর ঈশিকা বলল, “স্যার, যা শুনছি কালকের এই মিটিংটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বোর্ড যা ডিসিশন নেবে পরিবেশ দূষণের উপর তার ফলাফল সুদূরপ্রসারী হতে পারে। তাই ভাবছিলাম ডক্টর চ্যাটার্জির সঙ্গে একবার যদি কথা বলা যেত। আমি বাংলায় লিখলেও আজকাল দেশের আরও অনেক ইংরেজি কাগজে অনুবাদ করে ছাপা হয়। মোটামুটি দেশের মানুষ এ ব্যাপারে ওঁর স্ট্যান্ডটা জানতে পারত।” তারপর হেসে ফেলে বলল, “উনি যা গম্ভীর মানুষ, সরাসরি কথা বলতে সাহস হয় না।”
সোমক বললেন “তুমি নিশ্চয়ই জানো সে মিডিয়াকে পারতপক্ষে এড়িয়ে চলে। তাছাড়াও কালকের মিটিংয়ের আগে কোথাও মুখ খুলবে বলে মনে হয় না।”
ঈশিকা একটা দুষ্টু হাসি দিয়ে বলল, “স্যার, তাহলে আপনাকে বলি, আজ রাতে সেভিকোর মুখপাত্র রেজার সঙ্গে আমার ইন্টারভিউ আছে। কিন্তু একতরফাভাবে ওঁর মতামত আমরা ছাপাতে চাই না।”
সোমক মনে মনে হাসলেন। মেয়েটি আটঘাট বেঁধেই এসেছে। তিনি বললেন, “আমি যেটা করতে পারি, কালকের মিটিংয়ের পরে তোমার সঙ্গে পাঁচ মিনিট কথা বলার জন্য অহিকে বলে দেখতে পারি। রাজি হবে কি না সেটা ওর ব্যাপার।”
ঈশিকা হাসিমুখে বলল, “তাতেই হবে স্যার। অনেক ধন্যবাদ।”
তাঁরা উঠে পড়লেন।
রাতে কিছুক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে এখানকার বিখ্যাত রামেন খেলেন। সুস্বাদু তো বটেই, দামও ঠিকঠাক।
অহিভূষণ বললেন, “টোকিও হল ফুড লাভারদের স্বর্গ। এখানে মিশেলিন স্টার হোটেলের ছড়াছড়ি। এরা দাবি করে এরা নাকি ফ্রেঞ্চ কুইজিন ফরাসিদের থেকেও ভালো বানাতে পারে।”
৬
অহিভূষণের পাশের সিটে সোমক। তাঁরা একটি ছোটোখাটো অডিটোরিয়ামে বসে আছেন। তবে সিটগুলি আগে পিছে নয়, স্টেজ ঘিরে অর্ধবৃত্তাকারে সাজানো। স্টেজে কয়েকটি চেয়ার রাখা আছে, সম্ভবত এফ.এস.বি-র মেম্বাররা এখানে বসবেন। অন্য পাশে একটি পোডিয়াম। বোর্ড মেম্বাররা ছাড়া প্রায় সকলেই এসে গেছেন। অনেকেই উঠে এসে অহিভূষণের সঙ্গে হাত মিলিয়ে যাচ্ছেন। দেশের বাইরেও তাঁর বন্ধুটির জনপ্রিয়তা দেখে সোমক মনে মনে পুলকিত হচ্ছেন। অহিভূষণ কারো-কারো সঙ্গে তার আলাপ করিয়ে দিচ্ছেন। যেমন ক্যামিলা, তিনি সিলভানার চিফ পাবলিক রিলেশন অফিসার। ইনি অহিভূষণের পাশেই বসেছেন। আর একজন জোনাথন, ইনি ইউ.এন.ও-র ক্লাইমেট সেলের বিশেষ প্রতিনিধি হয়ে এসেছেন।
সবার শেষে এক ভদ্রলোক এলেন। ছোটোখাটো নির্বিরোধী চেহারা। দুই হাত জড়ো করে নমস্কার করে হাসিমুখে বললেন, “আমি রেজা।”
অহিভূষণের মুখে চওড়া হাসি ফুটল। তিনি বললেন, “আপনার কথা আমি শুনেছি।”
দু-চারটি ভদ্রতাসূচক কথা বলে রেজা নিজের সিটে ফিরে গেলেন।
একটু পরেই বোর্ড মেম্বাররা ঢুকে এক এক করে নিজেদের আসনে বসলেন। এদের একজন সপ্রতিভ অল্পবয়সি একটি ছেলে, নাম হাবিব, উঠে দাঁড়িয়ে নিজের ও অন্যদের পরিচয় দিল। অন্যরা উঠে দাঁড়িয়ে হাসিমুখে হাত নাড়লেন। এদের মধ্যে একজন বোর্ডের চেয়ারম্যান মাসুকা।
পরিচয়পর্ব শেষ হলে হাবিব স্টেজে উঠে পোডিয়ামে গিয়ে দাঁড়াল। সকলকে স্বাগত জানিয়ে বলল, “আপনাদের অনুমতি নিয়ে আমরা মিটিং শুরু করতে চাই। আজকের মিটিংয়ের ব্যাকগ্রাউন্ড ও উদ্দেশ্য আপনারা সকলেই জানেন, তবু আনুষ্ঠানিকভাবে আপনাদের দেখাব।”
সে স্টেজের পিছনের স্ক্রিনে পরপর কয়েকটি স্লাইড দেখাল। তাতে প্রস্তাবিত জি.এম. প্ল্যান্টেশন, সিলভানার কিছু তথ্য ও বক্তব্য, পরিবেশবাদীদের প্রতিবাদী বক্তব্য ইত্যাদি দেওয়া আছে। দেখানো শেষ করে সে সামনে বসা মাসুকার দিকে তাকাল। মাসুকা উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, “বিষয়টি স্পর্শকাতর ও জটিল। তাই আমরা উভয়পক্ষকেই সামনাসামনি বক্তব্য পেশ করার ও আলোচনা করার একটা সুযোগ করে দিতে চাই। প্রথমে আমি সিলভানার প্রতিনিধিকে তাঁদের বক্তব্য পেশ করতে আহ্বান জানাচ্ছি।”
ক্যামিলা পোডিয়ামের সামনে এসে দাঁড়ালেন। বললেন, “আমরা প্রস্তাবিত প্ল্যান্টেশন সম্পর্কে মোটামুটি সব তথ্য ইতোমধ্যেই বোর্ডকে লিখিতভাবে জানিয়েছি। সেটাই আপনাদের সঙ্গে শেয়ার করছি।”
স্ক্রিনে পরপর কয়েকটি স্লাইড ফুটে উঠল। তাতে প্ল্যান্টেশনে কীটনাশকের ব্যবহার, জলের ব্যবহার, সয়েল কনজারভেশন ইত্যাদি বিভিন্ন তথ্য সবিস্তারে দেওয়া আছে। শেষ স্লাইডটিতে পরিবেশ দূষণ ও গ্লোবাল ওয়ার্মিং নিয়ে কিছু তথ্য দেখানো হয়েছে।
ক্যামিলা বললেন, “আমাদের প্রকল্পের গাছগুলি অন্যান্য গাছের তুলনায় বাতাস থেকে অনেক বেশি কার্বন শোষণ করবে। ফলে পরিবেশ দূষণ অনেকটাই কমবে।”
ক্যামিলা থামলেন। এক যুবক উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “এটা কি ঠিক যে দু-হাজার আঠারো সালে ব্রাজিলে আপনাদের ইউক্যালিপ্টাস প্ল্যান্টেশনের জন্যে আশেপাশের গ্রামগুলির কলা চাষিদের ক্ষেত প্রায় নষ্ট হয়ে গেছিল?”
ক্যামিলা শান্ত স্বরে বললেন, “প্রথমত, এ ব্যাপারে কোনও ডকুমেন্টেড প্রুফ নেই। বিষয়টি এখনও বিচারাধীন। তবুও অভিযোগ উঠেছে বলে পরিবেশ রক্ষার স্বার্থে আমরা নতুন প্রোজেক্টের জন্য কতগুলি সিদ্ধান্ত নিয়েছি এবং বোর্ডকে লিখিতভাবে প্রতিশ্রুতি দিয়েছি। একর প্রতি কীটনাশকের পরিমাণ নিয়ে বোর্ডের নির্দেশিত সীমার থেকেও অনেক কম আমরা ব্যবহার করব। নতুন ডিজাইন অনুযায়ী, আমাদের গাছগুলি আরও বেশি পেস্ট রেজিস্ট্যান্ট হবে। তাই অতিরিক্ত কীটনাশকের প্রয়োজনও হবে না। বোর্ড বা বোর্ড অনুমোদিত যে-কোনো সংস্থা এ বিষয়ে নিয়ম মেনে যখন খুশি আমাদের অডিট করতে পারে।”
আরও কয়েক মুহূর্ত অপেক্ষা করে ক্যামিলা নেমে গেলেন।
মাসুকার ইঙ্গিতে রেজা পোডিয়ামে উঠে এলেন। সকলকে অভিবাদন জানিয়ে সংক্ষেপে নিজের পরিচয় দিয়ে তিনি বললেন, “প্রথমে আমি আপনাদের একটি ছোটো ভিডিও দেখাতে চাই।”
স্ক্রিনে দেখা গেল লন্ডনের বিখ্যাত এক পত্রিকার সাংবাদিক ব্রাজিলের প্ল্যান্টেশনের পাশের কয়েকটি গ্রামের চাষিদের ইন্টারভিউ নিচ্ছেন। চাষিরা সকলেই জানালেন, প্ল্যান্টেশন চালু হবার পর থেকে তাঁদের কলার খেত ধীরে ধীরে প্রায় নষ্ট হয়ে গেছে। অনেকেই জমিজমা বিক্রি করে শহরে চলে গেছেন। কোম্পানির কাছ থেকে কোনও ক্ষতিপূরণ এখনও পাওয়া যায়নি।
রেজা বললেন, “এছাড়া চায়নায় একটি জি.এম. প্ল্যান্টেশন হয়েছিল বহুবছর আগে। সে সম্বন্ধে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায় না। আমাদের এক সহকর্মী অনেক চেষ্টা করে সেই সময়কার একটি নিউজ পেপারের রিপোর্ট জোগাড় করেছেন।”
তিনি স্ক্রিনে রিপোর্টটি দেখালেন। সংক্ষিপ্ত কয়েক লাইনের রিপোর্ট। প্ল্যান্টেশনের আশেপাশের এলাকার চাষিরা ভূগর্ভের জলস্তর নেমে যাওয়ায় চাষের কাজে প্রচণ্ড অসুবিধা হচ্ছে বলে দাবি করেছেন। তাঁরা সকলে মিলে শহরে এসে প্রশাসনের কাছে বিক্ষোভ জানিয়েছেন।
রেজা একটু থেমে কোনও প্রশ্নের জন্য অপেক্ষা করলেন। তারপর মৃদু হেসে বললেন, “তবে এ সবই অনেকদিন আগের কথা। ব্রাজিলের প্ল্যান্টেশনটিরও প্ল্যানিং ও ডিজাইন করা হয় আজ থেকে প্রায় দশ বছর আগে। তারপর সমাজ এগিয়েছে, মানুষ এখন পরিবেশ সম্বন্ধে অনেক বেশি সচেতন। সিলভানার মতো নামকরা প্রতিষ্ঠান তাদের নতুন প্রকল্পে পরিবেশ ও ক্ষুদ্র চাষিদের স্বার্থ রক্ষার ব্যাপারে দায়িত্বশীলভাবে কাজ করবেন বলেই আমাদের বিশ্বাস।”
চাপা একটা বিস্ময়সূচক গুঞ্জন উঠল। ক্যামিলা আড়চোখে অহিভূষণের দিকে তাকিয়ে দেখলেন, তিনি নির্বিকার।
রেজা বললেন, “তবে আমি আপনাদের অস্ট্রেলিয়ার বিখ্যাত পরিবেশ বিজ্ঞানী হার্কারের বক্তব্যও শোনাতে চাই।”
পর্দায় হার্কারের মুখ ভেসে উঠল। পিছনে অরণ্যের পটভূমি। সামান্য ভূমিকার পর তিনি বললেন, “জি.এম. ট্রি প্ল্যান্টেশনের প্রধান ঝুঁকি হল এই কৃত্রিম গাছগুলি খুব সহজেই প্রাকৃতিক অরণ্যে বংশবিস্তার করতে পারে। এক্ষেত্রে দূরত্ব বজায় রাখা বা স্প্যাশিয়াল সেপারেশন কোনও সমাধান নয় কারণ, বাস্তবে দেখা গেছে পরাগরেণু এবং বীজের মাধ্যমে যে-কোনো প্রজাতির গাছ কয়েকশো কিমি. দূরের অরণ্যেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। এই গাছগুলি যেহেতু স্বাভাবিক গাছের তুলনায় অনেক শক্তপোক্ত, এরা ধীরে ধীরে সমগ্র বনভূমি দখল করে নেবে। এক-একটি অরণ্যকে ঘিরে লক্ষ লক্ষ বছর ধরে কীটপতঙ্গ, পশুপাখি এবং অরণ্যবাসী মানুষদের নিয়ে এক জটিল বাস্তুতন্ত্র গড়ে উঠেছে। প্রকৃতি একে নিয়ন্ত্রণ করে। এটি নষ্ট হয়ে গেলে অসংখ্য প্রজাতি বিলুপ্ত হবে। এছাড়া সারা পৃথিবীজুড়ে প্রায় দেড় বিলিয়ন মানুষ অরণ্যসম্পদের উপর নির্ভর করে বাঁচে। তাদের জীবিকা বিপন্ন হবে। এই প্রক্রিয়া একবার শুরু হয়ে গেলে থামানো প্রায় অসম্ভব।”
ভিডিওটি শেষ হল। রেজা বললেন, “ওঁর শেষ কথাটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। জি.এম. গাছগুলি একবার ছড়িয়ে পড়তে শুরু করলে কোথায় গিয়ে থামবে কেউ জানে না। কয়েক দশক পরে হয়তো পৃথিবীর স্বাভাবিক অরণ্যসম্পদ সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে যাবে। না হলেও জেনেটিক পলিউশনের জন্য গাছগুলির স্বাভাবিক বিবর্তন প্রক্রিয়া ও টিকে থাকার ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যেতে পারে।”
তিনি পোডিয়াম ছেড়ে স্টেজের সামনে এসে দাঁড়ালেন। বোর্ডের সদস্যদের দিকে তাকিয়ে আবেগমথিত কণ্ঠে বললেন, “আপনারা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে নিশ্চয়ই এই সম্ভাবনা খতিয়ে দেখবেন। আ রং স্টেপ ক্যান চেঞ্জ দা ফেস অফ দিস প্লানেট।”
তিনি নিজের আসনে ফিরে গেলেন। ঘরটি নিঃশব্দ। ক্যামিলার মুখে ছায়া পড়েছে। বোর্ডের সদস্যরা মৃদু স্বরে নিজেদের মধ্যে কিছু আলোচনা করছেন। সোমক স্বীকার করতে বাধ্য হলেন, উগ্র বিরোধিতা না করেও রেজা নিজের বক্তব্য ঠান্ডা মাথায় পেশ করে সদস্যদের প্রভাবিত করতে পেরেছেন।
মাসুকা ক্যামিলার দিকে তাকিয়ে বললেন, “আপনাদের আর কিছু বক্তব্য আছে?”
ক্যামিলা বললেন, “হ্যাঁ, আমাদের তরফে ড. অহিভূষণ কিছু বলবেন।”
অহিভূষণ ধীর শান্ত পদক্ষেপে পোডিয়ামে গিয়ে দাঁড়ালেন। কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বললেন, “এই প্রকল্পের মুখ্য বৈজ্ঞানিক হিসাবে মাননীয় বোর্ড সদস্যদের এবং অন্যান্যদের সামনে আমি মাত্র দুটি বিষয় রাখতে চাই। আপনারা জানেন, গ্রিনহাউস গ্যাস এমিশন এবং গ্লোবাল ওয়ার্মিং পৃথিবীর সামনে এখন সবথেকে বড়ো সমস্যা। আমাদের প্ল্যান্টেশনের গাছগুলি যে পরিমাণ কার্বন শোষণ করবে, সে ব্যাপারে সিলভানা দীর্ঘদিন ফিল্ড ট্রায়াল করেছে। সে সম্বন্ধে যাবতীয় তথ্য আমরা বোর্ডকে জমা দিয়েছি।”
তিনি মাসুকার দিকে তাকালেন। মাসুকা ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানালেন।
অহিভূষণ বললেন, “এই তথ্যের ভিত্তিতে আমরা অত্যন্ত জটিল ও সময়সাপেক্ষ একটি কম্পিউটার সিমুলেশন করেছি। এখানে আমরা দেখাতে চেয়েছি পৃথিবীর সর্বাপেক্ষা দূষিত দশটি শহরের আশেপাশে যদি বেশ কিছু এই ধরণের প্ল্যান্টেশন তৈরি করা হয়, তাহলে মাত্র দু-বছর পরে দূষণের উপর কী প্রভাব পড়বে।”
স্ক্রিনে ধীরে ধীরে নিউ ইয়র্ক, বেইজিং, দিল্লি, মুম্বই ও অন্যান্য শহরের নাম ফুটে উঠল। এদের প্রতিটির ক্ষেত্রেই দূষণমাত্রা বিপদসীমার অনেক ঊর্ধ্বে। পরের স্লাইড সিমুলেশনের পর। দেখা গেল শতকরা নব্বই ভাগ শহরে দূষণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। কয়েকটিতে বিপদসীমার নীচে নেমে গেছে।
হলজুড়ে বিস্ময় ও শ্বাসটানার শব্দ উঠল। এক ভদ্রলোক হাত তুললেন। মাসুকা অনুমতি দিলেন। ইনি নিউ ইয়র্কের একটি পত্রিকার সাংবাদিক। তিনি বললেন, “এই কম্পিউটার সিমুলেশন কীভাবে করা হয়েছে, এই ফোরকাস্ট কতটা নির্ভরযোগ্য, সে ব্যাপারে কিছু বলবেন?”
অহিভূষণ বললেন, “এতে যে ডেটা বা তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে তা আমাদের ফিল্ড ট্রায়ালের রেজাল্ট। আগেই বলেছি সেই তথ্য আমরা অফিশিয়ালি বোর্ডকে জমা দিয়েছি। বোর্ড চাইলে আপনাদের সঙ্গে শেয়ার করতে পারেন। দ্বিতীয়ত, এই কম্পিউটার মডেলিং ওয়ার্ল্ড মেটিওরলজিক্যাল ব্যুরোকে দিয়ে করানো হয়েছে। আপনাদের যা দেখালাম তা তাঁদেরই রিপোর্ট। স্বাক্ষরিত মূল রিপোর্ট বোর্ডকে দেওয়া হয়েছে।”
আর একটি মেয়ে হাত তুলে বলল, “জি.এম. প্ল্যান্টেশনের ধারণাটা নতুন নয়। এর আগে দূষণমুক্তির কথা এইভাবে ভাবা হয়নি কেন?”
অহিভূষণ মৃদু হেসে বললেন, “কারণ, এতদিন যে জি.এম. গাছের নকশা ব্যবহার করা হয়েছে, আমাদের গাছগুলির কার্বন শোষণ ক্ষমতা তার থেকে বহুগুণ বেশি।”
মেয়েটি আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল, মাসুকা নিজে থেকেই বললেন, “সিলভানার রিপোর্ট আমরা দেখেছি। বেশ ইম্প্রেসিভ। কিন্তু রেজা-র দু নম্বর পয়েন্টটার বিষয়ে কী বলবেন? এইভাবে পৃথিবীকে দূষণমুক্ত করতে হলে আমাদের কতটা ঝুঁকি নিতে হবে?”
অহিভূষণ শান্তভাবে বললেন, “আমার মতে, খুবই কম। কারণ, আমাদের জি.এম. গাছগুলি সেলফ-পলিনেট করবে, অর্থাৎ এরা পরাগ রেণু ছড়িয়ে বংশবৃদ্ধি করবে না। তাই আশেপাশের প্রাকৃতিক অরণ্যে জেনেটিক পলিউশন হবার কোনও সম্ভাবনা নেই।”
রেজার ভুরু কুঁচকে উঠল। মাসুকার পাশ থেকে আর একজন বোর্ড মেম্বার বললেন, “কিন্তু এইভাবে বংশবিস্তার তো কিছু অর্কিড ও অল্প কিছু অন্য প্রজাতির গাছই করে, তাও প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে। কৃত্রিমভাবে এই পদ্ধতির প্রয়োগ নিয়ে সবে চিন্তাভাবনা শুরু হয়েছে বলেই জানতাম।”
এবারে ক্যামিলা বললেন, “ড. অহিভূষণ এ নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরে গবেষণা করছেন। আমাদের সহায়তায় বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে সফলভাবে পরীক্ষা নিরীক্ষাও করা হয়েছে। সব রিপোর্ট আমরা গতকাল বোর্ডকে জমা দিয়েছি। উনি পেটেন্টের জন্য আবেদনও করেছেন।”
সদস্যরা মুখ চাওয়াচাওয়ি করলেন।
মাসুকা রেজাকে বললেন, “এ ব্যাপারে আপনাদের বক্তব্য?”
রেজা বললেন, “এটি একটি সম্পূর্ণ নতুন তথ্য, খতিয়ে দেখতে আমাদের সময় চাই। তবে তার আগে আমি ডক্টর অহিভূষণকে দু-একটি প্রশ্ন করতে চাই।”
মাসুকা বললেন, “অবশ্যই। আমরা রিপোর্টটি খতিয়ে দেখে আগামীকাল আমাদের ওয়েবসাইটে তুলে দেব। আপনাদের কিছু বক্তব্য থাকলে এক সপ্তাহের মধ্যে লিখিতভাবে জানাবেন। তারপর আমরা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেব। আপাতত আপনার কী প্রশ্ন আছে করতে পারেন।”
রেজা অহিভূষণের দিকে তাকিয়ে বললেন, “এই বিষয়টি নিয়ে মাত্র এক বছর আগে একটি গবেষণা পদ্ধতি একমাত্র সিকল সেল অ্যানিমিয়া বা অন্য দু-একটি প্রাণঘাতী রোগের ক্ষেত্রেই অনুমোদিত, তাও দীর্ঘ পরীক্ষানিরীক্ষার পর।”
অহিভূষণ বললেন, “আমি যথাসাধ্য উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করছি। অন্তত জি.এম. ক্রপ বা জি.এম. ট্রির ক্ষেত্রে জিন এডিটিংয়ের লক্ষ্য হচ্ছে প্রকৃতিকে ছাড়িয়ে যাওয়া। আমরাও সেই চেষ্টাই করেছি। দ্বিতীয়ত, জিন এডিটিংয়ের পদ্ধতি ক্রমশ উন্নত হচ্ছে। সেই সঙ্গে আজকাল কম্পিউটার সিমুলেশন করে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব অনেকটাই বোঝা সম্ভব।”
রেজা বললেন, “আপনি ‘অনেকটাই’ বললেন। আপনার কি মনে হয় না সম্ভাব্য ভয়ংকর পরিণতির কথা মাথায় রেখে পুরোপুরি নিশ্চিত না হয়ে এই ধরনের প্ল্যানন্টেশনের কাজ শুরু করা উচিত নয়?”
অহিভূষণ কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইলেন। তারপর শান্ত গলায় বললেন, “না, আমি তা মনে করি না। ঝুঁকি না নিলে বিজ্ঞান এতদূর এগোতে পারত না। তাছাড়া দূষণ ও গ্লোবাল ওয়ার্মিং এখন যেখানে এসে দাঁড়িয়েছে, ঝুঁকি না নেওয়াই সবথেকে বড়ো ঝুঁকি হতে পারে। এছাড়াও আপনি নিশ্চয়ই জানেন, আজকাল প্রাকৃতিক অরণ্যে জিন পলিউশন মনিটর করার বিভিন্ন উপায় আছে। বিভিন্ন সরকারের পরিবেশ ও বনবিভাগ সহজেই সে কাজটা করতে পারে। সন্দেহজনক কিছু পাওয়া গেলে পদক্ষেপ নেওয়া যেতেই পারে।”
রেজা উত্তেজিত হয়ে কিছু বলতে যাচ্ছিলেন। মাসুকা হাত তুলে তাকে থামিয়ে দিলেন। বললেন, “দু-পক্ষের বক্তব্যই আমরা শুনেছি। সবদিক বিবেচনা করে শীঘ্রই আমরা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেব।”
অহিভূষণ নেমে এসে সোমকের পাশে বসলেন। প্রেক্ষাগৃহে মৃদু করতালির শব্দ শোনা গেল। সোমক বন্ধুর পিঠে হাত রেখে বললেন, “ফাটাফাটি বলেছিস তো!”
অহিভূষণ একটা ফিচেল হাসি দিয়ে বললেন, “ও-ব্যাটাও কম সেয়ানা নয়। প্রায় ঘাম ছুটিয়ে দিয়েছিল। দেখা যাক কী হয়।”
তাঁরা বেরোনোর সময় ইউনিফর্ম পরা একটি ছেলে এসে বলল, “স্যার, বাইরে বিশাল মিডিয়া অপেক্ষা করছে। আপনি যদি কথা বলতে না চান পিছনের গেট দিয়ে আপনাকে বার করে দিচ্ছি।”
অহিভূষণ ঘাড় নাড়লেন। হোটেলে ফিরে ঈশিকার সঙ্গে কথা বলতে তিনি ইতোমধ্যেই রাজি হয়েছেন।
৭
সেদিন রাতে সোমক একটা স্বপ্ন দেখলেন। তিনি বিশাল একটি অরণ্যের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন। নিস্তব্ধ নির্জন অরণ্য। পাখির ডাক নেই, মৌমাছির গুঞ্জন বা অরণ্যের স্বাভাবিক কোনও শব্দ নেই। ঝোপঝাড়ে জন্তুজানোয়ারদের চলাফেরার শব্দও শোনা যাচ্ছে না। যতদূর চোখ যায় নিষ্প্রাণ সবুজ এক অরণ্য যেন কালনিদ্রায় মগ্ন। সারি সারি দীর্ঘ বলিষ্ঠ গাছগুলির পাতায় সূর্যের আলো ঠিকরে এসে ছুরির মতো তাঁর চোখে এসে বিঁধছে।
সোমক স্বপ্নের মধ্যেই শিউরে উঠলেন।
লেখকের ধরতাই
জি.এম. বা জেনেটিক্যালি মডিফায়েড শস্যের কথা সকলেই জানেন। বিভিন্ন দেশে ফলন বাড়ানোর জন্য এই পদ্ধতি এখন প্রায়ই ব্যবহৃত হয়। যদিও এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে প্রচুর বিতর্ক ও আশঙ্কা এখনও আছে। তুলনায় প্ল্যান্টেশনে জি. এম. ট্রি বা জেনেটিক্যালি মডিফায়েড গাছের ব্যবহার অপেক্ষাকৃত নতুন। এই গাছগুলির বৃদ্ধি দ্রুত হয়, কীটনাশক প্রতিরোধ করতে পারে এবং প্রাকৃতিক বিপর্যয় প্রতিরোধ করার ক্ষমতা বেশি। অর্থাৎ, ব্যবসায়িকভাবে বিশেষ লাভজনক। কেউ কেউ দাবি করেন, এই গাছগুলির বাতাস থেকে কার্বন শোষণ করার ক্ষমতা বেশি তাই এরা দূষণ কমাতেও সাহায্য করবে। পরিবেশবাদীরা অবশ্য বিভিন্ন কারণে এর তীব্র বিরোধিতা করছেন।
(এই গল্পে উল্লেখিত চরিত্র, সংস্থা ও ঘটনাবলি সম্পূর্ণ কাল্পনিক। বাস্তবের সঙ্গে কোনও মিল পাওয়া গেলে তা লেখকের অনিচ্ছাকৃত ও অনভিপ্রেত বলেই ধরে নিতে হবে।)
জয়ঢাকের গল্পঘর
এই লেখকের কুড়িটি কিশোর কাহিনির সঙ্কলন ‘ভয়ের ভাক্সিন” বইটি সম্বন্ধে জানতে ও জয়ঢাক প্রকাশনের বুকস্টোর থেকে অর্ডার দিতে নীচের ছবিতে ক্লিক করুন
