চোখে দেখা গল্প-জিরেন কাটের রস  ও পাখিও আমাদের স্বজন -অমরেন্দ্র চক্রবর্তী-শীত ২০২৪

জিরেন কাটের রস  

chokhedekhagolpo9102

যারা গ্রামে থাকো তারা নিশ্চয়ই শীতের ভোরে খেজুর রস খেয়েছ? জন্ম থেকেই শহরে থাকো তারা শীতকালে গাছ থেকে পাড়া খেজুর রসের স্বাদ কল্পনা করতে পারবে না। গাছের গায়ে ঝোলানো মাটির হাঁড়িতে সারা রাত ধরে রস জমতে থাকে, ভোরবেলা সেই রসের কলসি নামানো মাত্র সে- রস খেয়ে ছোটবেলায় আমি ভাবতাম এ বুঝি স্বর্গের দেবদেবীদের কাছে পাঠাবার জন্য।

খেজুর রস জ্বাল দিয়েই আবার গুড় হয়। অল্প জ্বাল দেওয়া নলেন গুড়, অনেকক্ষণ ধরে আগুন কমিয়ে-বাড়িয়ে জ্বাল দিয়ে ঘন দানা দানা গুড়ও হয়। আর খেজুর রসের পাটালি যা হয় তা দেখতে বিরাট একটা পূর্ণিমার চাঁদের মতো। আর খেতে? জিভে দিলে গলে যায়, মুখ সুগন্ধে ভরে যায়। সে স্বাদ-গন্ধ লিখে বোঝানো যায় না। গ্রামের যে বাড়ির উঠোনে কাঠের আগুনে রস জ্বাল দিয়ে গুড় বানানো হয় সে-বাড়ির আকাশ-বাতাস গুড়ের স্বর্গীয় গন্ধে ম-ম করে।

ছোটবেলা থেকে এই গন্ধ আর এই স্বাদ আমার চেনা। সেইজন্যই শহরের নাম করা কোম্পানির চমৎকার সব মোড়কে মোড়া দামি দামি চকোলেট খাবার ইচ্ছে হয় না। চকোলেট খেতে যে খুব খারাপ লাগে তা কিন্তু নয়, দুয়েকটা বেশ ভালোই, প্যাকেজিং দেখে তো চোখ সরানোই যায় না, কিন্তু আমার সেই গ্রামের জিরেন কাটের রস আর টাটকা রসের গুড় ও পাটালির স্বাদ এতে পাই না।

জিরেন কাটের রস কাকে বলে জানো?

পরপর কয়েকদিন গাছ থেকে রস কাটার পর কয়েকটা দিন গাছটাকে জিরোতে দিয়ে নতুন করে আবার যে রস কাটা হয় তাকেই বলে জিরেন কাটের রস। আবার, খেজুরগাছও তো আসলে কাঠই, সেই কাঠ কাটা ক’দিন বন্ধ থাকে বলে অনেকে এই রসকে বলে জিরেন কাঠের রস। ভারি মিষ্টি সেই রস।

বাংলার অনেক গ্রামে আমি ঘুরে বেড়িয়েছি। শীতের দিনে যখন যে গাঁয়েই গেছি, সেখানেই শিউলিরা সক্কালবেলা খেজুরগাছ থেকে রসভরা হাঁড়ি নামিয়ে আমাকে খেতে দিয়েছে। কখনও কখনও জিরেন কাটের রসও মিলেছে।

শিউলি কাদের বলে জানো তো? যারা খেজুরগাছের বুক চেঁছে সেখানে নলের মতো একটা কাঠি গেঁথে তার নীচেই গাছের গায়ে সন্ধেবেলা হাঁড়ি বেঁধে আসে। ভোরবেলা রসভরা হাঁড়ি নামিয়ে আনে।

chokhedekhagolpo9101

 

পাখিও আমাদের স্বজন

chokhedekhagolpo9103

আমাদের চারদিকে রোজ কতরকম পাখি আসে, ভালো করে দেখলে আমাদের তোমরা অবাক হয়ে যাবে। কাক-কোকিল, শালিখ-চড়াই, দোয়েল-বুলবুলি, টিয়া-টুনটুনি, ছাতারে, ফিঙে- এসব তো আছেই, তাছাড়াও আরও অনেক পাখি আমরা প্রায় রোজই দেখি। আরও যে কতরকম পাখি আগে আমাদের খুব কাছাকাছি চলে আসত, আশপাশের গাছে সারা বেলা কিচিরমিচির করে খাবার খুঁজে বেড়াত, এখন আর তেমন আসে না, তাদের সংখ্যাও কিন্তু অনেক।

এদের অনেকেই ছিল আমাদের পাড়াপড়শির মতন। কাছাকাছি গাছের ডালে পাতায় বাসা বাঁধত। বাসায় ডিম পাড়ত। ডিম ফুটে ছানা হত। মা-পাখি বনে বনে ঘুরে ঠোঁটে করে পোকা-মাকড় খুঁটে এনে বাচ্চাদের খাওয়াত। বাচ্চারা মায়ের ডানার শব্দে আগে থেকেই খাওয়ার জন্য অস্থির হয়ে মস্ত বড়ো হাঁ করে অপেক্ষা করে থাকত।

আমি যখন ছোট ছিলাম তখন যত পাখি দেখতাম, বাড়ির উঠোনে, পাঁচিলে, কাছাকাছি জামরুল সবেদা আমলকী গাছে বা বনেবাদাড়ে ঘুরে বেড়িয়ে,  এখন আর তত পাখি চোখে পড়ে না।

এখন পাখি দেখতে আপিস থেকে ছুটি পেলে চলে যাই ভারতের কোনও অভয়ারণ্যে। কখনও ভরতপুরে, কখনও কোচবিহারের রসিক বিলে, কখনও-বা রায়গঞ্জের কুলিক-এ। শীতকালে কলকাতার খুব কাছে সাঁতরাগাছির বিলে, বর্ধমানের পূর্বস্থলির চুপির চরে, সুন্দরবনের সজনেখালিতে যদি যাও তো পাখি দেখে তোমাদের শুধু চোখই জুড়োবে না, পাখিরা মানুষের কত কাছের প্রাণী, আমাদের হারানো যুগের কত আপনজন, সেটা বুঝতে পেরে মন আনন্দে ভরে উঠবে।

দেশ-বিদেশে ঘুরতে ঘুরতে অচেনা মানুষের সঙ্গে পরিচয় হলে যেমন কিছুক্ষণের মধ্যেই চিরচেনা বন্ধু বলে চেনা যায়,  মন দিয়ে পাখি দেখে বেড়ালে চেনা পাখিকে তেমনই ভুলে-যাওয়া আপনজন বলে চিনতে পারবে। আমি তো আমাদের অরুণাচলের বনে, আমাজনের জঙ্গলে, আফ্রিকা-মহাদেশে পাখি দেখতে দেখতে হঠাৎ আবিষ্কার করেছিলাম- পৃথিবীর এই তিন অংশই ধনেশ পাখির মাতৃভূমি। পরস্পরের এত দূরে এই তিন দেশ তো সেই কোন আদ্যিকাল থেকে মানুষেরও বাসভূমি,  সেই যখন মানুষ ছিল অরণ্যবাসী,  গভীর বনের পশুপাখিদেরই ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী।

আরও অনেক দেশে এরকম আরও অনেক পাখি দেখতে দেখতে আমার মনে গভীর বিশ্বাস জন্মে গেছে যে প্রাচীনকালে পাখিরা মানুষের আত্মীয়স্বজনের মতোই ছিল। মাস কয়েক আগে উগান্ডায় গিয়ে শুনলাম, মানুষের মুখের ভাষা নাকি আদতে পাখির ডাক শুনে-শুনেই সৃষ্টি হয়েছে।

কথাটা আমার খুব সত্যি বলে মনে হয়। একবার আফ্রিকার তৃণভূমিতে জিরাফ-জেব্রা, সিংহ-শিয়াল, হাতি-জলহাতি, ন্যু-নেকড়ের ছবি তুলতে গিয়ে সাতাশরকম পাখির দেখা পেয়েছিলাম। তাদের নানা সুরের নানান ধ্বনি শুনে, পরস্পরের উদ্দেশে ডাকাডাকির ছন্দ তাল শুনতে শুনতে হঠাৎই আমার মনে হয়েছিল এরা নিশ্চয়ই নিজেদের মধ্যে কথা বলছে। মানুষও হয়তো পাখির এইসব ডাক শুনতে শুনতে কথা বলা শিখেছে।

অলঙ্করণ– যুধাজিৎ সেনগুপ্ত

“স্বর্ণাক্ষর” থেকে প্রকাশিত ‘চোখে দেখা গল্প’ বই থেকে নেয়া। লেখক ও প্রকাশকের অনুমতিক্রমে।

——————————————————

আগের পর্বগুলো- বন্ধু বানরদল, ট্রেন চড়ল জাহাজে, জুনপুটের সন্তোষ মাঝি, নীলনদের ফেরিওয়ালা, তাঁবুতে রাত্রিবাসপুরনো ডাকাতদলের আস্তানায়, ভেলায় চড়ে ভারত মহাসাগর, আফ্রিকার সেৎসি মাছি ও বুলগেরিয়ার গোলাপ, লঙ্কাদেশের অশোকবনে,ঠাম্মু-দিদুর গল্প বলা, রাত্তিরেতে বেজায় রোদ ও উঠোনে বনের বাঘ, আকাশে ঘুড়ির পাল, আদ্যিকালের আগুন আর কাগজ

 

Leave a Reply